পাত সংস্থান বা প্লেট টেকটোনিক
ফরাসি বিজ্ঞানী লা ৺পিচো পাত তত্ত্বের সর্বাধুনিক ব্যাখ্যা দেন। তার ব্যাখ্যায় গতির ফলে পর্বত, খাত, সামুদ্রিক শৈলশিরা, ভূমিকম্প, অগ্ন্যুদগম, সুনামি, তপ্ত বিন্দু বা হটস্পট প্রভৃতি সৃষ্টি সম্বন্ধে সামগ্রিক ধারণা পাওয়া যায়। এই অবদানের জন্য লা ৺পিচোকে পাত তত্ত্বের প্রকৃত জনক বলা হয়। এই তথ্যই মহীসঞ্চরণ ও সমুদ্র তলদেশের সঞ্চরণকে দৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
পাত এর সংজ্ঞা:
পৃথিবীর মহাদেশ ও মহাসাগর গুলো কঠিন খন্ড হিসাবে অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের উপর ভাসমান। এই ভাসমান অংশগুলিকে পাত বা প্লেট বলে।
অন্যভাবে বলা যায়, ভূত্বক বা শিলামন্ডল বিভিন্ন আয়তনে বিভক্ত এক একটি ভাগকে পাত বা প্লেট বলে।
তত্ত্বের মূল বক্তব্য:
1.মহাদেশীয় এলাকায় পাতগুলি পুরু এবং মহাসাগরীয় এলাকায় পাতগুলি পাতলা।
2. পাতগুলির গর গভীরতা 100 কিমি।
3.পাতগুলি সান্দ্র অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের ওপর ভাসছে।
4.ভূগর্ভের প্রচন্ড উষ্ণতার জন্য সৃষ্ট পরিচলন স্রোতের প্রভাবে পাতাগুলি গতিশীল অবস্থায় রয়েছে।
5.পাতগুলির সীমানা বরাবর ভূত্বকের পরিবর্তন ঘটে চলেছে।
পাতের শ্রেণীবিভাগ:
ইহাকে দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। যথা-
1.অবস্থান অনুসারে শ্রেণীবিভাগ 2.আয়তন অনুসারে শ্রেণীবিভাগ
অবস্থান অনুসারে শ্রেণীবিভাগ:
অবস্থান অনুসারে পাতকে দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। যথা-
1.মহাদেশীয় পাত
2.মহাসাগরীয় পাত
মহাদেশীয় পাত:
ভূত্বকের উপর মহাদেশ গুলি যে কঠিন শিলার চাদর দিয়ে তৈরি, তাকে মহাদেশীয় পাত বলে। এই পাতগুলি প্রধানত গ্রানাইট শিলা দ্বারা গঠিত। এই পাতগুলির ঘনত্ব 2.8 গ্রাম/ঘনসেমি। এই পাতগুলির গড়়বেধ 20 থেকে 70 কিমি। এই পাতগুলি সিলিকা ও অ্যালুমিনিয়াম দ্বারা গঠিত। উদাহরণ- ইউরেশীয় পাত।
মহাসাগরীয় পাত:
ভূত্বকের ওপর মহাসাগরের তলদেশ যে কঠিন শিলার চাদর দিয়ে তৈরি, তাকে মহাসাগরীয় পাত বলে। এই পাতগুলি প্রধানত ব্যাসল্ট শিলা দিয়ে গঠিত। এই পাতগুলির গড় ঘনত্ব 2.9 গ্রাম/ঘনসেমি -3.3গ্রাম/ঘনসেমি। পাতগুলির গড়়বেধ 8 কিমি। এই পাতগুলি প্রধানত সিলিকা ও ম্যাগনেসিয়াম দ্বারা গঠিত। উদাহরণ - প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত
আয়তন অনুসারে শ্রেণীবিভাগ:
আয়তন অনুসারে পাতকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। যথা- 1.বৃহদায়তন পাত
2.ক্ষুদ্রায়তন পাত
বৃহদায়তন পাত:
পৃথিবীতে মোট 7টি বড় পাত আছে। যথা-
প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত
উত্তর আমেরিকা পাত
দক্ষিণ আমেরিকা পাত
আন্টার্টিকা পাত
আফ্রিকা পাত
ইউরেশীয় পাত
ভারতীয় পাত
ক্ষুদ্রায়তন পাত
পৃথিবীতে মোট 8টি মাঝারি ও 20টি ছোট পাতা আছে। যথা-আরবীয় পাত, পানামা পাত , সোমালিপাত প্রভৃতি।
বিভিন্ন প্রকার পাত সীমান্ত:
পাত সীমান্ত:
ক্ষুদ্রমন্ডল এর ওপর সঞ্চারণশীল ভাসমান মহাদেশীয় ও মহাসাগরীয় দুই বা তিনটি পাতের মিলনক্ষেত্রকে পাত সীমানা বা পাত সীমান্ত বলে।
সাধারণভাবে বিজ্ঞানীরা চার প্রকার পাত সীমান্তের অস্তিত্ব লক্ষ্য করেছেন। যথা-
1.অভিসারী পাত সীমানা বা ধ্বংসাত্মক পাত সীমানা
2.প্রতিসারী পাত সীমানা বা গঠনকারী পাত সীমানা
3.নিরপেক্ষ পাত সীমানা বা ট্রান্সফর্ম চ্যুতি
4.ত্রিপাত সীমানা
অভিসারী পাত সীমানা বা ধ্বংসাত্মক পাত সীমানা:
দুটি সমধর্মী বা ভিন্নধর্মী পাত যখন পরস্পরের দিকে এগিয়ে এসে মিলিত হয় তখন তাকে অভিসারী পাত সীমানা বলে। এই পাত সীমানায় একটি পাত নিম্নগামী হয়়ে ভূঅভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং প্রচণ্ড উষ্ণতায় গলে যায়, তাই একে বিনাশকারী বা ধ্বংসাত্মক পাত সীমানা বলে।
পাতের প্রকৃতি অনুসারে অভিসারী পাত সীমান্তকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
1.মহাদেশীয়-মহাদেশীয় পাত সীমানা
2.মহাসাগরীয়-মহাসাগরীয় পাত সীমানা
3.মহাদেশীয়-মহাসাগরীয় পাত সীমানা
মহাদেশীয়-মহাসাগরীয় মহাদেশীয় পাত সীমানা:
দুটি সমধর্মী মহাদেশীয় পাতের মিলনস্থলে সংঘর্ষ হলে, তাকে মহাদেশীয়-মহাদেশীয় পাত সীমানা বলে।
সৃষ্ট ভূমিরূপ:
অভিসারী চলন এর ফলে দুটি পাতা পরস্পরের মুখোমুখি হয় এবং ভারীপাত অপেক্ষাকৃত হালকা পাতের নীচে ভূগর্ভে ঢুকে যায়।
ভঙ্গিল পর্বত গঠন গঠিত হয় যেমন-হিমালয় পর্বত।
উদাহরণ-ভারতীয় পাত ও ইউরেশীয় পাতের মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে হিমালয় পর্বতের সৃষ্টি হয়েছে।
মহাসাগরীয় মহাসাগরীয় পাত সীমানা:
দুটি ভারী মহাসাগরীয় পাতের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে, তাকে মহাসাগরীয়-মহাসাগরীয় পাত সীমানা বলে।
সৃষ্ট ভূমিরূপ: বৃত্তচাপীয় দ্বীপমালা সৃষ্টি।
উদাহরণ- প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও ভারত মহাসাগরীয় পাতের সংঘর্ষের ফলে ইন্দোনেশিয়া দ্বীপসমূহের সৃষ্টি হয়েছে।
মহাদেশীয় মহাসাগরীয় পাত সীমানা:
অপেক্ষাকৃত ভারী মহাসাগরীয় পাত ও হালকা মহাসাগরীয় পাতের সংঘর্ষে মহাসাগরীয় মহাদেশীয় পাতের তলায় প্রবেশ করে এই সীমান্তকে মহাদেশীয় মহাসাগরীয় পাত সীমান্ত বলে।
সৃষ্ট ভূমিরূপ: আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি হয়। কাডিিলেরা জাতীয় পর্বত শ্রেণী সৃষ্টি হয়।
উদাহরণ-উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা পাতের নিচে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাতের চলন এর ফলে দুই আমেরিকার পশ্চিম ভাগে রকি, আন্দিজ প্রভৃতি ভঙ্গিল পর্বতশ্রেণী গঠিত হয়েছে।
প্রতিসারী পাত সীমানা বা গঠনকারী পাত সীমানা:
যে পাত সীমানা বরাবর দুটি পাত পরস্পর থেকে দূরে সরে যায় সেই সীমানাকে প্রতিসারী পাত সীমানা বলে।দুটি পাত পরস্পর থেকে দূরে সরে গেলে যে শূন্যস্থান সৃষ্টি হয় সেই স্থান দিয়ে ভূ অভ্যন্তরস্থ উত্তপ্ত গলিত ম্যাগমা ও লাভার রূপে বেরিয়ে আসে এবং নতুন ভূত্বকের সৃষ্টি করে, তাই এই সীমানাকে গঠনকারী পাত সীমানা বলে।
সৃষ্ট ভূমিরূপ: এই সীমানা বরাবর সামুদ্রিক শৈলশিরা (মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা), মহাসাগর (আটলান্টিক মহাসাগর), গস্ত উপত্যকা (আফ্রিকার পূর্ব ভাব),সাগর (লোহিত সাগর) প্রভৃতি সৃষ্টি হয়েছে।
নিরপেক্ষ পাত সীমানা বা ট্রান্সফর্ম চ্যুতি:
ভূপৃষ্ঠে ফাটল বরাবর উলম্ব দিকে ভূত্বকের সরন না হয়ে যখন দুটি পাত পাশাপাশি অবস্থান করে এবং একটি পাত অন্য একটি পাতের বিপরীত দিকে অনুভূমিকভাবে সরণ ঘটলে যে চ্যুতির সৃষ্টি হয়, তাকে ট্রান্সফর্ম চ্যুতি বলে। এই সীমান্তকে নিরপেক্ষ সীমান্ত বলে। এই সীমান্ত বরাবর ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
উদাহরণ- ক্যালিফোর্নিয়া সানা আন্দ্রিজ চ্যুতিরেখা প্রায় হাজার কিমি দীর্ঘ এবং এই রেখা বরাবর প্রায় পাঁচশ ষাট কিমি ব্যাপী চলন হয়েছে।
ত্রিপাত সীমানা:
যে অঞ্চলে তিনটি পাত একে অপরের মুখোমুখি হয়, তাকে ত্রিপাত সীমানা বলে।
উদাহরণ- আন্টার্টিকা পাত, প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত ও নাজকা পাতের মিলন স্থলে এইরূপ ত্রিপাত সীমানা দেখা যায়।
No comments:
Post a Comment