পৃথিবীর মহাদেশ ও মহাসাগরগুলোর আপেক্ষিক অবস্থান আপাততভাবে স্থির এবং বর্তমান অবস্থা মনে হলেও অতি প্রাচীনকালে এগুলো এমন অবস্থানে ছিল না, তেমনি অদূর ভবিষ্যতে এগুলোর বর্তমান অবস্থানগত অবস্থান থাকবে না। এগুলোর অবস্থান পরিবর্তনশীল। ভূত্বকইয় অবস্থা, জীবাশ্মগত প্রমাণ, জলবায়ুগত প্রমাণ প্রভৃতি থেকে বোঝা যায় যে, মহাদেশ ও মহাসাগর এর অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে। এ থেকেই মহাদেশীয় সঞ্চারণ ধারণার উদ্ভব ঘটে।
মহাদেশ গুলির অবস্থানগত পরিবর্তন সম্পর্কে সর্বপ্রথম চিন্তাভাবনা করেছিলেন ফরাসি বিজ্ঞানী স্নাইডার এবং মার্কিন বিজ্ঞানী টেলর। পরবর্তীকালে এদের চিন্তা ভাবনা সার্থকভাবে যুক্তি সহকারে প্রকাশ করেছিলেন জার্মান আবহবিদ আলফ্রেড ওয়েগনার তার গবেষণার মাধ্যমে। 1912 খ্রিস্টাব্দে আলফ্রেড ওয়েগনার এই মতবাদের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন।
মহীসঞ্চরণ মতবাদের মূলকথা:
1.পৃথিবী সিলিকা, অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, নিকেল ও লোহার দ্বারা গঠিত।
2.লঘু ঘনত্বের সিয়াল স্তর মহাদেশ গঠন করছে এবং মহাদেশগুলি সিমা স্তরের উপর ভাসছে।
3.গুরু ঘনত্বের সীমা মহাসাগরের তলদেশ গঠন করছে। 4.আজ থেকে প্রায় 34 কোটি বছর পূর্বে কার্বনিফেরাস উপযুগে সমস্ত মহাদেশগুলি একত্রিত হয়ে একটি বৃহৎ আয়তন গঠন করেছিল। যার নাম প্যানজিয়া।
4.প্যানজিয়া কে ঘিরে রেখেছিল একটি বৃহৎ আয়তন মহাসাগর যা পৃথিবীর সমস্ত সাগর একত্রিত হয়ে গঠিত গড়ে উঠেছিল। যার নাম প্যানথালাসা।
5.মেসোজোয়িক যুগ এর শুরু থেকে অর্থাৎ 22 কোটি বছর পূর্বেই প্যানজিয়া ভেঙে টুকরো হয়ে যায় এবং বিভিন্ন দিকে পরস্পর থেকে দূরে সরে যায়।
মহীসঞ্চরণের কারণ:
মহাদেশীয় সঞ্চারণ কতগুলি কারণে সংঘটিত হয় এগুলি হল-
1.প্রবল জোয়ার ভাটার টান:
মূলত চন্দ্র-সূর্যের প্রবল আকর্ষণে পৃথিবীপৃষ্ঠে প্রবল জোয়ারের সৃষ্টি হয়। এই প্রবল জোয়ারি বলের প্রভাবে প্যানজিয়া বহুধাবিভক্ত হয়েছে। এই কারণে মহাদেশের পশ্চিমে সঞ্চরণ ঘটেছে।
যেমন- আমেরিকার পশ্চিমে সঞ্চরণ।
2.বৈষম্যমূলক অভিকর্ষজ বল:
এতে বলা হয়, সিয়াল অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার এর তরলে ভাসমান অবস্থায় আছে। এতে সিয়ালের তার কেন্দ্রগামী বল অপসারিত তরলের প্লাবতা কেন্দ্রগামী বল ওই বিন্দু দুটির মধ্য দিয়ে প্রসারিত অনুভূমিক রেখার লম্বদিকে কাজ করে। ওই সমান অথচ বিপরীতমুখী বল একই রেখা বরাবর কাজ না করার ফলে ভাসমান মহাদেশ বহুধাবিভক্ত হয়।
মহীসঞ্চরণের ফলাফল:
আজ থেকে প্রায় 22 কোটি বছর আগে প্যানজিয়া নামে বিশাল মহাদেশটি ভাঙতে শুরু করে, ফলে বিভিন্ন মহাদেশ, মহাসাগর ও পর্বতমালা সৃষ্টি হয়।
লরেসিয়া সৃষ্টি:
প্যানজিয়া উত্তর-দক্ষিণ দুটি বিশাল ভূখণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়। উত্তর অংশের নাম লরেসিয়া বা আঙ্গারল্যান্ড। পরে লরেশিয়া ভেঙে এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা মহাদেশের সৃষ্টি হয়।
গন্ডোয়ানাল্যান্ড সৃষ্টি:
প্যানজিয়া দক্ষিণ অংশের নাম গন্ডোয়ানাল্যান্ড ।পরবর্তীকালে গন্ডোয়ানাল্যান্ড ভেঙে আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, ভারতীয় উপদ্বীপ এবং আন্টার্টিকা মহাদেশের সৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়াও বিভিন্ন পর্বতের যেমন হিমালয়, অল্পস, রকি , আন্দিজ এবং বিভিন্ন মহাসাগরের যেমন ভারত মহাসাগর প্রশান্ত মহাসাগর আটলান্টিক মহাসাগর প্রভৃতি সৃষ্টি হয়েছে।
মহীসঞ্চরণের স্বপক্ষে যুক্তি:
ওয়েগনার তার মহীসঞ্চরণ তত্ত্বের স্বপক্ষে কতকগুলি প্রমাণ উল্লেখ করেন।
1.জিগ-স-ফিট:
ওয়েগনারের মতে একটি ছিন্ন ছবির টুকরোগুলোকে যেমন পাশাপাশি জোড়া লাগিয়ে সম্পূর্ণ ছবি গড়ে তোলা যায়, তেমনি আটলান্টিক মহাসাগরের দুপাশে মহাদেশগুলোকে জোড়া লাগিয়ে একটি বিশাল ভূভাগ তৈরি হয়। এই পরস্পর খাঁজে খাঁজে জোড়া লাগানো বিষয়টিকে জিগ-স-ফিট বলে অভিহিত করেন। এর সাহায্যে তিনি প্রমাণ করেন মহাদেশগুলি পূর্বে একত্রে ছিল এবং মহীসঞ্চরণ এর ফলে মহাদেশ গুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছায়।
2.হিমবাহ গঠিত ভূমিরূপ এর সাদৃশ্য:
ওয়েগনারের মতে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া কার্বনিফেরাস যুগ থেকে পার্মিয়ান যুগ পর্যন্ত একসঙ্গে পরপর জুরে একটি সুবিস্তৃত মহাদেশ তৈরি করেছিল। ফলে সমগ্র ভূখণ্ডটিতে একই ধরনের মহাদেশীয় হিমবাহ গঠিত ভূমিরূপ লক্ষ্য করা যায়।
3.ভাঁজের সাদৃশ্য:
আটলান্টিক মহাসাগরের দুদিকে অবস্থিত ইউরোপ মহাদেশ ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অবস্থিত গ্রীনল্যান্ডের একই ধরনের ক্যালিডোনিয়ান ও হারসিনিয়ার যুগে পর্ব্বত গঠনকারী ভাঁজের সাদৃশ্য এই মহাদেশ দুটি একদা একত্রে অবস্থান এর প্রমাণ দেয়।
4.জলবায়ুগত প্রমাণ:
পার্মিয়ান কার্বনিফেরাস যুগ এর কয়লা স্তর এবং পাললিক শিলা স্তর এর সাথে লবণ স্তরের উপস্থিতি প্রমাণ করে উত্তর আমেরিকা প্রথমে নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূক্ষ্ম মরুভূমির এবং শেষে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে অবস্থান করছে।
5.প্রাণী গত প্রমাণ:
I. দক্ষিণ আমেরিকার চিলিতে এবং অস্ট্রেলিয়ার ক্যাঙ্গারু পাওয়া যায় এছাড়া দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের প্রাণী জীবাশ্ম পাওয়া যায় যা প্রমাণ করে একত্রে অবস্থান করে।
Ii. জলহস্তী কেবল আফ্রিকা ও মাদাগাস্কারে পাওয়া যায় এই দুই স্থলভাগের মধ্যে দূরত্ব 250 কিনে তাই জলহস্তীর মত প্রাণীর পক্ষে এই দূরত্ব সাঁতার কাটা অসম্ভব অর্থাৎ এই ঘটনা ওয়েগনারের প্যান জিয়ার অস্তিত্বকে সমর্থন করে।
Iii. সুমেরু অঞ্চলে ডায়নোসরের পায়ের ছাপ পাওয়া যায় এলাকার প্রাণী তৃণভোজী সুমেরু অবস্থান পরিবর্তন কালে জলবায়ু পরিবর্তন ঘটেছে ফলে গাছপালা ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছে ফলে এই বিশাল আকৃতির পানি খাদ্যাভাবের অভাবে মারা গেছে।
6.উদ্ভিজ্জ প্রমাণ:
ব্রাজিল ভারত আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া প্রাপ্ত গ্লসপটেরিস নামক এক প্রকার একপ্রকার ফান মহীসঞ্চরণ মতবাদের জোরালো সমর্থন করে উপরিউক্ত বিভিন্ন প্রমাণের ভিত্তিতে ওয়েগনার তার মহীসঞ্চরণ তত্ত্বের এবং পরবর্তী সময়ে সেটি ভেঙ্গে বিভিন্ন মহাদেশ এভাবে সঞ্চারিত হওয়ার যুক্তি দেখিয়েছেন।
মহীসঞ্চরণ তত্ত্বের সমালোচনা:
আলফ্রেড ওয়েগনার 1912 সালে খ্রিস্টাব্দে প্রথম মহীসঞ্চরণ কথা বললেও 1924 খ্রিস্টাব্দে যখন তত্ত্বটি ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়, তখন বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ যেমন A. Washington, H. jafrey, এবং E.W.Berry প্রমূখরা সমালোচনা করেন যেসব কারণে মহীসঞ্চরণ তত্ত্বটি সমালোচিত হয়। সেগুলি হল-
1.প্রয়োজনীয় বল বা শক্তির অভাব:
বিভিন্ন ভূবিজ্ঞানী হিসাব করে দেখেছেন যে মহাদেশীয় সঞ্চারণ এর জন্য যে বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন তা জোয়ারি বল থেকে হাজার কোটি গুণ বেশি হওয়া দরকার। এছাড়া বৈষম্যমূলক অভিকর্ষক বলও মহীসঞ্চরণ এর জন্য যথেষ্ট নয়।
2.ত্রুটিপূর্ণ জিগ-স-ফিট:
ওয়েগনারের বিচ্ছিন্ন মহাদেশ গুলি উপকূলরেখার মধ্যে যে মিল দেখিয়েছেন বিশেষত আটলান্টিক মহাসাগরের পূর্ব পশ্চিম উপকূলে জোড়া যতটা নিখুঁত দেখিয়েছেন, বাস্তবে তা কিন্তু ঠিক নয়।
3.পর্বত সৃষ্টি সংক্রান্ত ব্যাখ্যা দুর্বলতা:
উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তে আন্দিজ, রকি প্রভৃতি পর্বতের উৎপত্তি সম্পর্কে ওয়েগনারের ব্যাখ্যা কেউ মেনে নেননি।
4.আগ্নেয় শিলার সাদৃশ্যগত অস্পষ্টতা:
ওয়াশিংটনে মতে ওয়েগনার আটলান্টিকের দু'পাশের মহাদেশ গুলি শিলাস্তর বিশেষত্ব আগ্নেয় শিলার মধ্যে যে সাদৃশ্য দেখিয়েছেন বাস্তবের সঙ্গে তার মিল নেই।
5.সূচনা সময়কাল সম্পর্কিত অস্পষ্টতা:
ওয়েগনার কার্বনিফেরাস যুগে প্যানজিয়ার ভাঙ্গন এবং মহাদেশগুলির সঞ্চারনের সময়কাল বলে চিহ্নিত করেন । কিন্তু তার আগে কোনো শক্তি প্যানজিয়াকে একত্রে রেখেছিল তার কোন উত্তর তিনি দেননি।
6.জীবাশ্ম সংক্রান্ত চুক্তি দুর্বলতা:
অস্ট্রেলিয়া, ভারত, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ছাড়াও আফগানিস্তান, ইরান ও সাইবেরিয়াতে গ্লসপটেরিস উদ্ভিদের নিদর্শন পাওয়া যায়। কিন্তু এই সব নতুন নতুন জায়গায় জীবাশ্ম প্রাপ্তির কারণ বর্ণনা করতে হলে মহীসঞ্চরণ মতবাদকে নতুন ভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে।
বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা এই মতবাদের সমালোচনা করলেও আরথার হোমস, এভারেস্ট স্মিথ প্রমূখ বিজ্ঞানীগণ আধুনিক তত্ত্বের মাধ্যমে মহীসঞ্চরণ মতবাদকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। কারণ তত্ত্বের মাধ্যমে ভূতাত্ত্বিক, জীবতাত্ত্বিক এবং প্লেট ভূ-গাঠনিক মতবাদের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
No comments:
Post a Comment