পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত স্তরগুলিকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় , যথা-
1. ভূত্বক ( Crust )
2. গুরুমণ্ডল ( Mantle )
3. কেন্দ্রমণ্ডল ( Core )
ভূগর্ভের এই বিভিন্ন স্তরগুলির প্রকৃতি , উয়তা , ঘনত্ব ও চাপ ভূকম্প তরঙ্গের গতিবেগের পার্থক্যের মাধ্যমে বােঝা যায় ।
ভূত্বক ( Crust )
সংজ্ঞা : সবার ওপরে অবস্থিত হালকা ও কঠিন পদার্থে গঠিত যে স্তরটি পৃথিবীকে শক্ত আবরণে মুড়ে রেখেছে , তাকে ভূত্বক বা ক্রাস্ট বলে । ।
বৈশিষ্ট্য :
1) গভীরতা : মহাদেশের নীচে গড়ে 60 কিমি এবং মহাসাগরের নীচে গড়ে 5 কিমি গভীরতা পর্যন্ত ভূত্বক বিস্তৃত । এর গড় গভীরতা প্রায় 30 কিমি ।
2) উপাদান : ভূত্বকের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে রয়েছে অক্সিজেন ( O2 ) । এ ছাড়া সিলিকন ( Si ) , ম্যাগনেশিয়াম ( Mg ) , অ্যালুমিনিয়াম ( AI ) প্রভৃতি উপাদানে ভূত্বক গঠিত ।
3) উন্নতা বা তাপমাত্রা : পৃথিবী তাপ বিকিরণ করে গ্যাসীয় অবস্থা থেকে ক্রমশ শীতল হয়ে তরল হয় । তরল অবস্থা থেকে ক্রমশ শীতল হয়ে পৃথিবীর উপরিভাগের এই কঠিন আবরণটি সৃষ্টি হয় । ভূ - অভ্যন্তরের তিনটি স্তরের মধ্যে এই স্তরটির উন্নতা সবচেয়ে কম । ভূত্বকের গড় তাপমাত্রা 15°C ।
4) ঘনত্ব : ভূত্বক সবচেয়ে হালকা । এর ঘনত্ব 2 . 2 - 2 . 9 গ্রাম / ঘনসেমি ।
5) শিলা : ভূত্বক আগ্নেয় , পাললিক ও রূপান্তরিত এই তিন প্রকার শিলা দিয়ে গঠিত । এই শিলা নানা খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ । ভূত্বকের একেবারে ওপরে আছে মাটি ।
6) উপস্তর : ভূত্বকের দুটি অংশ । যথা —
A) সিয়াল : সিলিকন ( Si ) ও অ্যালুমিনিয়াম ( AI ) দ্বারা গঠিত ওপরের অপেক্ষাকৃত হালকা স্তরটি হল সিয়াল ( Si + A = Sial ) বা মহাদেশীয় ভূত্বক । এটি গ্রানাইট জাতীয় শিলায় গঠিত এবং মহাসাগরের নীচে অনুপস্থিত ।
B) সিমা : সিলিকন ( Si ) ও ম্যাগনেশিয়াম ( Mg ) দ্বারা গঠিত অপেক্ষাকৃত ভারী স্তরটি হল সিমা ( Si + Ma = Sima ) বা মহাসাগরীয় ভূত্বক । এটি ব্যাসল্ট জাতীয় শিলায় গঠিত এবং সিয়ালের নীচে অবস্থিত ।
7) বিযুক্তিরেখা : ভূত্বকের সিয়াল ও সিমার মাঝে রয়েছে । কনরাড বিযুক্তিরেখা এবং ভূত্বককে গুরুমণ্ডল থেকে পৃথক করেছে মােহােরাভিসিক বিষক্তিরেখা ।
গুরুমণ্ডল(Mantle)
সংজ্ঞা : ভূত্বকের নীচ থেকে পৃথিবীর অভ্যন্তরে কেন্দ্রমণ্ডলের ঊর্ধ্বভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় একই ঘনত্বযুক্ত স্তরকে গুরুমণ্ডল বা ম্যান্টেল বলে ।
বৈশিষ্ট্য :1) গভীরতা : ভূত্বকের নীচ থেকে প্রায় 2 , 900 কিমি গভীরতা পর্যন্ত গুরুমণ্ডল বিস্তৃত ।
2) উপাদান : এই স্তরের প্রধান উপাদান লােহা ( Fe ) , নিকেল ( Ni ) , ক্রোমিয়াম ( Cr ) , ম্যাগনেশিয়াম ( Mg ) ও সিলিকন ( Si ) ।
3) উম্নতা : এই স্তরের উয়তা 2000°c - 3000°C । •
4) ঘনত্ব : এখানে পদার্থের ঘনত্ব 3 . 4 – 5 . 6 গ্রাম / ঘনসেমি ।
5) উপত্তর : গুরুমণ্ডলের দুটি স্তর । যথা-
বহিঃগুরুমণ্ডল : গুরুমণ্ডলের 30 - 700 কিমি পর্যন্ত অংশে ক্রোমিয়াম ( Cr ) , লােহা ( Fe ) , সিলিকন ( Si ) ও ম্যাগনেশিয়ামের ( Mg ) প্রাধান্য দেখা যায় বলে একে ক্রোফেসিমা ( Crofesima ) বলে ।
অন্তঃগুরুমণ্ডল : 700 – 2 , 900 কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত অংশে নিকেল ( Ni ) , লােহা ( Fe ) , সিলিকন ( Si ) ও ম্যাগনেশিয়ামের ( Mg ) আধিক্যের জন্য একে নিফেসিমা ( Nifesima ) বলে ।
6) বিযুক্তিরেখা : গুরুমণ্ডল মােহােরাভিসিক বিযুক্তিরেখা দ্বারা ভূত্বক থেকে এবং গুটেনবার্গ বিযুক্তিরেখা দ্বারা কেন্দ্রমণ্ডল থেকে বিচ্ছিন্ন । আর বহিঃগুরুমণ্ডল ও অন্তঃগুরুমণ্ডলের সঙ্গে রয়েছে রেপিত্তি বিযুক্তিরেখা ।
কেন্দ্রমণ্ডল ( Core )
সংজ্ঞা : গুরুমণ্ডলের নীচে এবং পৃথিবীর কেন্দ্রের চারদিকে বেষ্টনকারী সর্বাধিক ঘনত্বযুক্ত স্তরকে কেন্দ্রমণ্ডল বা কোর বলে ।
বৈশিষ্ট্য :
1 ) গভীরতা : গুরুমণ্ডলের নীচে 2 , 900 কিমি থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র 6 , 370 কিমি গভীরতা পর্যন্ত কেন্দ্রমণ্ডল বিস্তৃত । অর্থাৎ , এই স্তরটি প্রায় 3 , 470 কিমি পুরু ।
2 ) উপাদান : এই স্তর অত্যন্ত ভারী নিকেল ( Ni ) ও লােহা । ( Fe ) দিয়ে গঠিত বলে একে নিফে ( Nife ) বলে ।
3 ) উষ্ণতা : এই স্তরের গড় উষ্ণতা প্রায় 5000°C ।
4 ) ঘনত্ব : এই স্তরের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি । গড় ঘনত্ব প্রায় 9 . 1 - 13 . 1 গ্রাম / ঘনসেমি ।
5 ) উপস্তর : বিজ্ঞানীরা কেন্দ্রমণ্ডলকে দুটি অংশে ভাগ । করেছেন ।
বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল : 2 , 900 – 5 , 100 কিমি গভীরতায় রয়েছে বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল । এর চাপ , তাপ ও ঘনত্ব অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলের তুলনায় কম হওয়ায় এখানে পদার্থ অর্ধকঠিন অবস্থায় আছে ।
অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল : পৃথিবীর কেন্দ্রের চারদিকে বেষ্টন । করে রয়েছে অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল । এর গভীরতা 5 , 100 – 6 , 370 তরের চাপ , তাপ ও ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি । অত্যধিক চাপে পদার্থগুলি এখানে কঠিন অবস্থায় আছে ।
6 ) বিযুক্তিরেখা : গুটেনবার্গ বিযুক্তিরেখা দ্বারা কেন্দ্রমণ্ডল গুরুমণ্ডল থেকে আলাদা হয়েছে । বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল ও অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলের মাঝে রয়েছে লেহম্যান বিযুক্তিরেখা ।
আমারা রাতের আকাশে যে তাঁরা দেখি আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগেও মানুষ সূর্য, তারা, উল্কা, ছায়াপথ, ধূমকেতু ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে তাদের সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করতো । সেই সময় আজকের মত বিজ্ঞান এত উন্নত ছিলনা । ঘড়ি, ক্যালেন্ডার, কম্পাসও ছিলনা । চাঁদ ও সূর্যের চলাচল দেখে দিন, দিক, মাস, সময়, বছর গণনা করা হত । সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মোটামুটি উপরের দিকে ১০০০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত যে শূন্যস্থান আছে তাকে আকাশ বলা হয় । পৃথিবী ছাড়িয়ে রাতের আকাশে তাকালে যতদূর দেখা যায় সেই বিশাল ফাঁকা শূন্যস্থান কে মহাকাশ বলে ।
মহাবিশ্ব :
মহাবিশ্ব সৃষ্টি নিয়ে বহু মতভেদ আছে । আধুনিক মত অনুসারে মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থ একটি বালির কণার থেকেও ছোটো অবস্থায় ছিল । প্রায় 1400 কোটি বছর আগে প্রচুর তাপ ও শক্তি নিয়ে এর প্রসারণ শুরু হয় । সেই সঙ্গে প্রচুর গ্যাসের মহাজাগতিক মেঘ ও ধূলিকণা তৈরি হয় । কোটি কোটি বছর ধরে এই গ্যাস আর মেঘ থেকে তৈরি হয় নীহারিকা,ছায়াপথ, গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, উল্কা, ধূমকেতু ইত্যাদি । মহাকাশের পরিসীমা ঠিক কতদূর সেটা মানুষের কল্পনার বাইরে । অর্থাৎ আমরা পৃথিবীর মানুষ মহাবিশ্ব সম্বন্ধে খুব সামান্যই জানতে পেরেছি।
মহাকাশে রয়েছে বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু ।
এগুলি হল - গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ, উল্কা, ধূমকেতু নীহারিকা ইত্যাদি । এখন আমরা এগুলি সম্বন্ধে কিছু কথা জেনে নেব ।
1.নীহারিকা –
মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় অসংখ্য ধূলিকণা গ্যাসের মহাজাগতিক মেঘ তৈরি হয় তা হল নীহারিকা । মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রায় ১০ লক্ষ বছর পর গ্যাসীয় পদার্থগুলি জমাট বেঁধে প্রচণ্ড গতিতে একে অপরের সাথে মিলে জ্বলন্ত নক্ষত্রের জন্ম দেয় । এই নীহারিকা থেকে নক্ষত্রদের জন্ম হয়েছে ।
2.ছায়াপথ –
মহাকাশের এক এক জায়গায় লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি তারা ও গ্যাসীয় বস্তু মিলে একটি বিশাল তারা জগত গড়ে তোলে, একে ছায়াপথ বলে । ছায়াপথ গুলি ডিম্বাকার, প্যাঁচালো ইত্যাদি নানা রকম হয় । খালি চোখে আমরা যে তারা দেখি সেগুলি আকাশগঙ্গা ছায়াপথের তারা । প্রায় ১০ হাজার কোটি নক্ষত্র, ধূলিকণা, গ্যাস মিলে আকাশগঙ্গা একটি বিরাট প্যাঁচানো ছায়াপথ । সূর্য, পৃথিবী ও অন্য গ্রহগুলি এই আকাশগঙ্গা ছায়াপথে রয়েছে ।
2.নক্ষত্র ও নক্ষত্রমণ্ডল –
যে সব জ্যোতিষ্কের নিজের আলো ও উত্তাপ আছে তাদের নক্ষত্র বলে । সূর্য নক্ষত্র আছে আমাদের থেকে ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে আছে । তারপর রয়েছে ৪১ লক্ষ কোটি কিলোমিটার দূরে নক্ষত্র প্রক্সি-মা সেন্তাউরি । জ্যোতির্বিজ্ঞানিরা মহাবিশ্বের বিভিন্ন নক্ষত্র ‘আলোকবর্ষ’ একক দিয়ে দূরত্ব পরিমাণ করেন । ১ সেকেন্ডে আলোর গতি প্রায় ৩০০,০০০ কিলোমিটার । এই হিসাবে আলো এক বছরে যত দূরত্ব অতিক্রম করে সেটাই হল আলোকবর্ষ । মনেকরা হয় যে নক্ষত্র গুলি নীহারিকা থেকে সৃষ্টি হয়েছে । নক্ষত্রদের রং দেখে আমরা সেই নক্ষত্র কতটা উত্তপ্ত অনুমান করতে পারি । লাল রঙের নক্ষত্রের উষ্ণতা সবথেকে কম, মাঝারি হলুদ নক্ষত্রের উষ্ণতা একটু বেশি । নীল নক্ষত্রের উষ্ণতা আরও একটু বেশি । সাদা রঙের নক্ষত্রের উষ্ণতা সবথেকে বেশি । অনেক নক্ষত্র কাছাকাছি অবস্থান করে, তাদের কাল্পনিক রেখা দিয়ে যোগ করলে বিভিন্ন আকৃতি গঠিত হয় । এদেরকে বলা হয় নক্ষত্রমণ্ডল । উত্তর আকাশে সাতটি নক্ষত্রের সমষ্টিকে সপ্তর্ষিমণ্ডল বলে । তাঁদের নাম প্রাচীনকালের সাত জন ঋষির নাম অনুসারে রাখা হয়েছে । এদের দেখতে অনেকটা ? চিহ্নের মত হয় । আবার ইংরেজি M অক্ষরের মত ক্যাসিওপিয়া । ক্রস চিহ্নের মত হল বকমণ্ডল । কালপুরুষ নক্ষত্র মণ্ডলকে পুরাকালের একজন বীর শিকারি হিসাবে কল্পনা করা হয়েছে । ধ্রুব তারাকে সারাবছর উত্তর আকাশে একই স্থানে দেখা যায় ।
3.গ্রহ ও উপগ্রহ –
যে সমস্ত জ্যোতিষ্কের নিজের আলো ও উত্তাপ নেই, যারা নক্ষত্রের আলোয় আলোকিত হয় তাদের গ্রহ বলে । আবার গ্রহদের চারিদিকে যারা ঘোরে তাদের উপগ্রহ বলে । উপগ্রহরা আলো নক্ষত্রদের কাছ থেকে পায় । সূর্যের চারিদিকে আবর্তন করে ৮ টি গ্রহ । এগুলি হল – বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, উরেনাস ও নেপচুন । চাঁদ হল পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ । চাঁদ তার আবর্তন ও পরিক্রমণ শেষ করে ২৭ দিন ৮ ঘণ্টায় । এছাড়াও অন্য গ্রহদের উপগ্রহ আছে । আগে প্লুটোকে গ্রহ হিসাবে ধরা হলেও এখন তাকে বামন গ্রহের তালিকায় রাখা হয়েছে ।
4.গ্রহাণুপুঞ্জ –
গ্রহের মত খুব ছোটো ছোটো জ্যোতিষ্ককে গ্রহাণুপুঞ্জ বলা হয় । এরাও এদের নির্দিষ্ট কক্ষপথে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে । মঙ্গল ও বৃহস্পতির মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার গ্রহাণুপুঞ্জ রয়েছে । সৌরজগতের সবথেকে বড়ো গ্রহাণুপুঞ্জ হল সেরেস ।
5.ধূমকেতু –
ধূমকেতু হল মহাকাশের এক প্রকার জ্যোতিষ্ক । এটি দেখতে দীর্ঘ লেজ বিশিষ্ট বা অনেকটা ঝাঁটার মত হয় । ধূমকেতুর মাথার দিকটা উজ্জ্বল আর লেজের দিকটা হয় বাস্পময় । সূর্যের কাছাকাছি এলে ধূমকেতুর ধুলো গ্যাস জ্বলতে আরম্ভ করে । একে অনেক বছর পর পর দেখা যায় । পৃথিবী থেকে হ্যালির ধূমকেতু ৭৬ বছর পর দেখা যায় । শেষ বার দেখা গেছে ১৯৮৬ সালে, আবার দেখা যাবে ২০৬২ সালে ।
6.উল্কা –
আমরা মেঘহীন রাতের আকাশে হঠাৎ আলোর পিণ্ড নীচে নেমে আসতে দেখি । একে বলা হয় তারা খসা বা উল্কাপাত । ধূমকেতু, গ্রহাণুপুঞ্জের বা কোনও নক্ষত্রের ভাঙ্গা টুকরো পৃথিবীর আকর্ষণে পৃথিবীর দিকে প্রবল গতিবেগে ছুতে আসে । বাতাসের সাথে ঘষা লেগে এরা জ্বলতে শুরু করে । বেশিরভাগ উল্কা বাতাসে পুড়ে যায় । আবার কখনো বড়ো উল্কার অংশ পৃথিবীর বুকে আছরে পড়তে পারে ।