Saturday, February 20, 2021

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়:
১.ভূমিক্ষয় রোধ করা:
মরু প্রান্তীয় এলাকায় মাটি ক্ষয় রোধ করতে ঢালু এলাকায় সমোন্নতিরেখা চাষ, বায়ুরোধক দেয়াল তৈরি করে বায়ুপ্রবাহ আটকানো, গাছপালা ও মুথা জাতীয় তৃণ লাগিয়ে বন বা তৃণভূমির আচ্ছাদন তৈরি করা, বাধ দিয়ে ভূপৃষ্ঠ প্রবাহ আটকানো প্রয়োজন।

২. বালিয়াড়ির প্রসার রোধ করা:
মরু লাগোয়া এলাকায় বালিয়াড়ির অগ্রগমন আটকাতে বালিয়াড়ির ওপর খরা প্রতিরোধ গাছ, গুল্ম ঝোপ, ঘাস লাগানো, চারপাশে শক্ত বেড়া দেওয়া, খনিজ তেলের গাদ ছড়ানো হয়। ভারতের Central arid zone research institute (CAZRI) কৃষি জমির পাশে বায়ুর গতির মুখে আড়াআড়িভাবে উদ্ভিদের প্রাচীর তৈরি করে বায়ুছেদ ঘটিয়ে কৃষিজমিকে বায়ু সঞ্চয় থেকে রক্ষা করছে। সাহারার দক্ষিণ প্রান্তে ৭০০০ কিমি দীর্ঘ এবং ১৫ কিমি গাছের প্রাচীর তৈরি করা হয়েছে।এটি গ্রেট গ্রীন ওয়াল (GGW) নামে পরিচিত।

৩. পশুচারণ ভূমির উন্নতি: 
জমির পোষণ ক্ষমতা অনুসারে নির্দিষ্ট সংখ্যক উট, ভেড়া, ছাগল পালন করা প্রয়োজন যাতে পদপিষ্ট হয়ে তৃণ নষ্ট না হয় । রাজস্থানে কিছু পঞ্চায়েত এরূপ নজরদারি চালু করেছে ।

৪.বৈজ্ঞানিক জল সেচ ও কৃষিকাজ:
উপযুক্ত মাত্রায় জলসেচ করতে হবে বা গর্ত খুঁড়ে, চেক ড্যাম তৈরি করে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করতে হবে। খরা প্রতিরোধ শষ্য যেমন মিলেট চাষ করা প্রয়োজন। মাটির আর্দ্রতা ও বৃষ্টিপাত এর ভিত্তিতে চাষাবাদ করতে হবে।



মরু অঞ্চল প্রসারণ এর কারণ ও ফলাফল

মরুভূমির প্রসারণ:
উষ্ণ মরুভূমির প্রান্তভাগে উৎপাদনশীল ভূমি ক্রমশ ঊষর মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াকে মরুকরণ বলে। মরুভূমির ক্ষেত্রমান বৃদ্ধিকে মরু প্রসারণ বলে।পৃথিবীর ৩৫% শতাংশ জমি দ্বারা আক্রান্ত। ফলে ৮৫ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পৃথিবীতে প্রতিবছর ৬০ হাজার বর্গ কিমি এলাকাতে মরু প্রসার ঘটেছে ।

মরু অঞ্চল সম্প্রসারণ এর কারণ:
মরু অঞ্চলের সম্প্রসারণ একটি অত্যন্ত ধীর প্রক্রিয়া হলেও এক্ষেত্রে ওই অঞ্চলের উষ্ণতা ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। মরু অঞ্চলের সম্প্রসারনের জন্য দায়ী কারণগুলি কে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।
যথা- প্রাকৃতিক কারণ ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণ
প্রাকৃতিক কারণ:
১.আবহাওয়ার পরিবর্তন:
 গ্রীন হাউস ইফেক্ট, ওজন গহবর সৃষ্টি, বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি, ধূলিঝড় প্রভৃতির ফলে বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মরু অঞ্চলের সম্প্রসারণ ঘটছে।
২.বায়ুর কার্য:
মরুভূমি অঞ্চলে বায়ুর কার্য ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করায় বালির অবক্ষেপণ-এর ফলে মরুভূমির প্রসার ঘটে। 
৩.খরা প্রবণতা:
পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে খরা প্রবণ অঞ্চলে মাটি শুষ্ক হয়ে ফেটে যায়। ফলে উদ্ভিদ ও প্রাণিকুল মারা যায়।ব্যাপকহারে ভূমিক্ষয় ও বৃষ্টিহীন অঞ্চল মরু অঞ্চলে পরিণত হয়।
মনুষ্য সৃষ্ট কারণ:
১.বনভূমি ধ্বংস:
নগরায়ন, শিল্পায়ন, অতিরিক্ত পশুচারণ, অসাধু চোরা শিকারিদের জন্য বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। ফলে উক্ত অঞ্চলটি বৃষ্টিহীন হয়ে পড়ছে এবং মরু অঞ্চলে সম্প্রসারণ ঘটছে।
২.অতিরিক্ত পশুচারণ:
জমির বহন ক্ষমতার তুলনায় কোন অঞ্চলে অত্যধিক পশুচারণ এর ফলে ওই অঞ্চল উদ্ভিদ শূন্য হয়ে পড়ে। ফলে পরোক্ষভাবে বৃষ্টিপাত কমে মরু অঞ্চলে পরিণত হয়।
৩.লবণাক্তকরন:
মৃত্তিকায় ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, লবণ অক্সাইড প্রভৃতি সঞ্চয়ের ফলে মৃত্তিকা শুষ্ক হয়ে যায়। ফলে ঐ অঞ্চলটি মরু অঞ্চলে পরিণত হয় ।
৪.অবৈজ্ঞানিক উপায়ে জলসেচ:
অবৈজ্ঞানিক উপায়ে জলসেচের ফলে মাটি লবণাক্ত ও অনুর্বর হয়ে যায়। যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মরু অঞ্চলের সম্প্রসারণের জন্য দায়ী।

মরু অঞ্চল সম্প্রসারণের ফলাফল:
১.মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়ে কৃষিজমি ধ্বংস হয়।
২.উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃত্যু ঘটে জীব বৈচিত্র্য হ্রাস পায়।৩. ৩.ভৌমজল ভান্ডারে সংকট সৃষ্টি হয়।
৪. মরুকরণ কবলিত এলাকা থেকে মানুষ পরিবেশগত পরিব্রাজনের বাধ্য হয়।


Thursday, December 24, 2020

বায়ুর ক্ষয় ও সঞ্চয় কার্যের ফলে গঠিত ভূমিরূপ

বায়ুর ক্ষয় কার্যের ফলে গঠিত ভূমিরূপ:

1.অপসারণ গর্ত বা ধান্দ:
বায়ু কোন স্থান থেকে প্রচুর  অসংবদ্ধ বালুকণা অন্যত্র স্থানান্তর করলে এক নীচু গর্তের সৃষ্টি হয়,যা ধান্দ বা অপসারণ গর্ত নামে পরিচিত। এরা সাধারণত দুটি বালিয়াড়ি মাঝে তৈরি হয়। এর ক্ষেত্রফল প্রায় 19,500 বর্গকিমি। উদাহরণ- আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা থেকে টেক্সাস পর্যন্ত অঞ্চলে কয়েকশো ফুট গভীর ও কয়েক মাইল ব্যাসার্ধ যুক্ত প্রচুর অপসারণ গর্ত দেখা যায়।

2.গৌর:
মরু অঞ্চলে বায়ুপ্রবাহকালে ভূপৃষ্ঠ থেকে 2 মিটারের মধ্যে অধিক পরিমাণে বালিকণা থাকায় এই অঞ্চলে অধিক ক্ষয় হয়। নিম্নাংশে অধিক পরিমাণে ক্ষয়ের ফলে মরু অঞ্চলে মাঝে মাঝে ব্যাঙের ছাতার মতো ওপরের অংশ প্রশস্ত ও সরু নিম্নাংশ বিশিষ্ট যে পাথরের অবশিষ্ট অংশ দেখা যায়, তাকে গৌর বলে। উদাহরণ: সাহারা মরুভূমিতে এই প্রকার ভূমিরূপ দেখা যায়। এগুলি ব্যাঙের ছাতার মতো দেখতে হয় বলে এদের মাশরুম রক বলে। একধিক গৌরকে গারা বলে

3.জুগ্যান:
মরু অঞ্চলে কঠিন ও কোমল শিলা অনুভূমিকভাবে অবস্থান করলে কঠিন শিলার দারুন ও ফাটল বরাবর বায়ু ক্ষয় করতে করতে নরম পৌঁছালে নরম শিলা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। এর ফলে কঠিন শিলায় চ্যাপ্টা মাথা বিশিষ্ট যে ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, তাকে জুগ্যান বলে। উদাহরণ- কালাহারি এবং অস্ট্রেলিয়ায় মরুভূমিতে এইরূপ ভূমিরূপ দেখা যায়। এদের মাথা গুলি চ্যাপ্টা হয় এবং ছোট ছোট ব্যাঙের ছাতার মতো দেখতে হয়।

4.ইয়ারদাং:
মরু অঞ্চলে কঠিন ও কোমল শিলা পাশাপাশি উলম্বভাবে অবস্থান করলে বৈষম্যমূলক ক্ষয়ের ফলে কঠিন শিলায় প্রাচীর ও কোমল শিলায় খাত সৃষ্টি হয়, একে ইয়ারদাং বলে। কোমল শিলা তুলনায় কঠিন শিলা 5-15 মিটার পর্যন্ত উঁচুতে অবস্থান করে। উদাহরণ:চিলির আটাকামা এবং তুর্কিস্তানের মরু অঞ্চলে এই ধরনের ভূমিরূপ দেখা যায়। ইয়ারদাং এর মাথাা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে তীক্ষ্ণ ও ছুঁচালো আকৃতির হলে তাকে নিডিল বলে।

5.ইনসেলবার্জ:
শুষ্ক মরু অঞ্চলে ক্ষয়কার্যের ফলে অনেক সময় কঠিন শিলা গঠিত মসৃণ গাত্র ও অবতল ঢাল বিশিষ্ট অনুচ্চভূমি অবস্থান করে, এদের ইনসেলবার্জ বলে। উদাহরণ: কালাহারি মরুভূমিতে এইরূপ ভূমিরূপ দেখা যায়। ইনসেলবার্জ অধিক ক্ষরিত হলে গোলাকার মস্তকবিশিষ্ট টিবিতে পরিণত হয়। তাকে বোনহার্ড এবং গভীর আবহবিকারের ফলে পাথরের খন্ডের স্তুপে পরিণত হলে তাকে ক্যাসলকপিজ বলে।


বায়ুর সঞ্চয় কার্যের ফলে গঠিত ভূমিরূপ:

1.বালিয়াড়ি:
বায়ুর সঞ্চয়কার্যের ফলে গঠিত প্রধান ভূমিরূপ হল বালিয়াড়ি।বায়ু তার প্রবাহ পথে কোন প্রকার প্রতিবন্ধক বা উঁচু নীচু ভূপ্রকৃতির দ্ব্বারা বাধাপ্রাপ্ত হলে ওই প্রতিবন্ধকের গায়ে বালি জমে যে স্তুপের সৃষ্টি করে তাকে বালিয়াড়ি বলে। বালি জমা হওয়ায় প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে একে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। যথাা-
i.বার্খান:
বায়ুর গতিপথে সঙ্গে আড়াআড়িভাবে অবস্থিত অর্ধচন্দ্রাকৃতি বালিয়াড়িকে বার্খান বলে। এর অনুবাত ঢাল খাড়া ও প্রতিবাত ঢাল মৃদু প্রকৃতির হয়। পৃথিবীর সব মরুভূমিতে বার্খান দেখা যায়। বার্খানের দুপাশে অর্ধচন্দ্রাকারে দুটি শিং এর মত মতো শিরা দেখা যায়। এর গড় উচ্চতা প্রায় 10 মিটার হলে প্রস্থে প্রায় 50-60 মিটার হয়।
ii.সিফ্ বালিয়াড়ি:
আরবি শব্দ সিফ্ কথার অর্থ সোজা তরবারি। বায়ুর গতিপথের সমান্তরালে গঠিত দীর্ঘ বালির শৈলশিরাাকে সিফ্ বালিয়াড়ি বলে। সাধারণত বার্খান থেকে সিফ্ বালিয়াড়ি সৃষ্টি হয়।সিফ্ বালিয়াড়ি দৈর্ঘ্যে কয়েকটি কিমি থেকে কয়েক শ' কিমি হতে পারে ও উচ্চতা কয়েকশো মিটার হয়। দুটিিি বালিয়াড়ির মাঝে বালিবিহীন হামাদা বা রেগ দেখা যায়। এই ধরনের বালিয়ারির শীর্ষষ তীক্ষ্ণ করাতের মত হয়। উদাহরণ সাহারা, অস্ট্রেলিয়া ও কালাহারি ও থর মরুভূমি।

2.লোয়েস সমভূমি:
বায়ুবাহিত অতিসূক্ষ্ম বালিকণা, মৃত্তিকাকনা প্রভৃতি উৎস অঞ্চল থেকে বহুদূরের কোন স্থানে অধঃক্ষিপ্ত হলে তাকে লোয়েস বলে। এই লোয়েস কনা জমা হওয়ার ফলে কোনো নিচু স্থানে যদি সমভূমির সৃষ্টি হয়, তবে তাকে লোয়েস সমভূমি বলে।
উদাহরণ: মধ্য এশিয়ার গোবি মরুভূমি বালুরাশি বাহিত হয়ে চীনের হোয়াংহো নদীর অববাহিকায় সঞ্চিত হয়ে লোয়েস সমভূমির সৃষ্টি হয়েছে।


বায়ু ও জলধারার মিলিত কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ:

1.ওয়াদি:
মরু অঞ্চলে বালুকারাশির মধ্যে হঠাৎ বন্যার জল তার প্রবাহপথে বেশিক্ষণ দাড়িয়ে থাকতে পারে না কিন্তু তার প্রবাহপথের চিহ্নস্বরূপ শুষ্ক খাতটি পড়ে থাকে। এরুপ শুষ্ক খাতটিকে ওয়াদি বলে।

2.পেডিমেন্ট:
'Pedi' শব্দটির অর্থ পাদদেশ এবং 'Mont' শব্দটির অর্থ পার্বত। সুতরাং পেডিমেন্ট বলতে পর্বতের পাদদেশের সমতল ভূমিকে বোঝায়। মরুভূমির মধ্যস্থিত পর্বতের পাদদেশে বায়ুপ্রবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে একপ্রকার প্রায় সমতলভূমির সৃষ্টি হয়। এরূপ প্রায় সমতল ভূমির ওপরের অংশ বেশ ঢালু হলেও তার নীচের অংশ মোটামুটি সমতল বলে এখানে ছোট ছোট জলধারা বাহিত শিলা চূর্ণ, নুড়ি, কাকর, বালি, কাদা ইত্যাদি সঞ্চিত হয়ে গঠন করে। এভাবে বায়ুর ক্ষয়কার্য এবং জলধারার সঞ্চয়কার্য যুগ্মভাবে মরুভূমির মধ্যস্থিত পার্বত্য অঞ্চলের পাদদেশে যে সমতলভূমি গঠন করে তাকে পেডিমেন্ট বলে। উদাহরণ: আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির উত্তর পশ্চিম প্রান্তে পেডিমেন্ট লক্ষ্য করা যায়।

3.বাজাদা:
বাজারে একটি স্পেনীয় শব্দ। যার অর্থ- পর্বতের পাদদেশীয় পলল সমভূমি।  এটি পর্বত সীমান্ত থেকে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। অবনত ভূমির চারদিকে পর্বতের পাদদেশে সৃষ্ট পলল শঙ্কু বা পলল পাখাগুলি ক্রমশ বিস্তার লাভ করতে করতে পরস্পর সংযুক্ত হয়ে উচ্চভূমি ও প্লায়া হ্রদের  মাঝে যে মৃদু ঢাল বিশিষ্ট ভূমি গঠন করে তাকে বাজাদা বলে। বাজাদার তলদেশে থাকে পেডিমেন্টেের আবৃত অংশ।

4.প্লায়া:
যখন মরু অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এরূপ একধিক জলধারা কোনো পর্বতবেষ্টিত অবনত ভূমিতে এসে সঞ্চিত হয়, তখন সেখানে হ্রদের সৃষ্টি হয়। মরু অঞ্চলের এই রূপ লবণাক্ত হ্রদকে সাধারণভাবে প্লায়া বলে। প্লায়া উত্তর আফ্রিকায় শট ,ভারতে রাজস্থানে ধান্দ,  যুক্তরাষ্ট্রে স্যালাইনা, যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাংশের ও মেক্সিকোতে এইরূপ পর্বতবেষ্টিত অববাহিকা বোলসন নামে পরিচিত। আরাবল্লী পর্বত অবস্থিত সম্ভর হ্রদ একটি প্লায়া।

Sunday, November 29, 2020

হিমবাহের ক্ষয় ও সঞ্চয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ

হিমবাহ পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাবে পার্বত্য অঞ্চলের তুষারক্ষেত্রে জমে থাকা বরফ অত্যন্ত ধীর গতিতে পর্বতের ঢাল বা সুনির্দিষ্ট খাত বা উপত্যাকা বরাবর নিচের দিকে নেমে আসে। এই তুষার প্রবাহকে বলে হিমবাহ। এটি একটি বিশাল বরফের স্তুপ যা বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে অবস্থান করে।

অবস্থান অনুসারে হিমবাহ কে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- ১.মহাদেশীয় হিমবাহ ২.পর্বত পাদদেশীয় হিমবাহ ৩.পার্বত্য বা উপত্যকা হিমবাহ।

হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ:

1.সার্ক বা করি:
উচ্চ পার্বত্য এলাকায় হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে যে অবতল আকৃতির উপত্যকা সৃষ্টি হয় তা দেখতে অনেকটা আরামকেদারার মত হয়। একে ফরাসি ভাষায় সার্ক এবং ইংরেজিতে করি বলে। বরফ মুক্ত হলে এই ভূমিরূপ দৃশ্যমান হয়। এর তিনটি অংশ থাকে- a.মস্তকের দিকে খাড়া প্রাচীর,  b.মধ্যভাগে খাত বা বেসিন, c.প্রান্ত দেশের চৌকাট বা করি ওষ্ঠ। করির মধ্যভাগের অবনত বেসিন অঞ্চলে জল জমে করি হ্রদের সৃষ্টি করে।

2.অ্যারেট:
পাশাপাশি প্রবাহিত দুটো হিমবাহের মধ্যে সংকীর্ণ ছুরির ফলার মতো তীক্ষ্ণ উচ্চভূমি বা বিভাজিকাকে অ্যারেট বা হিমশিরা বলে। এগুলি কখনও কখনও করাতের দাঁতের মতো খাঁজকাটা হয়ে থাকে।

3.পিরামিড চূড়া:
একটি পর্বতের বিভিন্ন দিকে কয়েকটি হিমবাহ বা সার্ক সৃষ্টি হলে, পর্বত শীর্ষটি পিরামিডের মতো খাড়া ও তীক্ষ্ণ অংশে পরিণত হয়, একে পিরামিড চূড়া বলে। হিমালয় পর্বতের নীলকণ্ঠ শৃঙ্গ্, নেপালের মাকালু এরূপ একটি পিরামিড চূড়া।

4.কর্তিত শৈলশিরা:
হিমবাহ পর্বতের উপত্যাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় উপত্যাকার  উভয় পার্শ্বস্থ স্পার বা পর্বতের অভিক্ষিপ্তাংশ সমূহের সম্মুখভাগগুলিকে কেটে দ্রোনী বা উপত্যাকাকে আরও চওড়া ও সোজা করে দেয়। এরূপ কর্তিত স্পার গুলিকে কর্তিত শৈলশিরা বলে। এটি দেখতে ত্রিভুজাকার। এরূপ উপত্যকার মধ্য দিয়ে হিমবাহ প্রবাহিত হওয়ার ফলে উপত্যাকার মধ্যভাগ খুব প্রশস্ত ও গভীর হয় এবং এর পার্শ্বদেশ খুব খাড়া হয়ে U আকৃতির উপত্যকায় পরিণত হয়।

5.'U' আকৃতির উপত্যকা বা হিমদ্রোণী:
হিমবাহের ক্ষয় কার্যের মাধ্যমে অত্যন্ত প্রশস্থ মোটামুটি মসৃণ ও খাড়া ঢ়ালের পার্শ্বদেশবিশিষ্ট যে হিমবাহ উপত্যকা সৃষ্টি হয় তাকে হিমদ্রোণী বলে। হিমদ্রোণী দেখতে ইংরেজি U অক্ষরের মত তাই একে U আকৃতির উপত্যকাও বলে। উদাহরণ- হিমালয়ের রূপকুণ্ড একটি হিমদ্রোণী ।

6.ঝুলন্ত উপত্যকা:
কোন মূল হিমবাহের একধিক উপহিমবাহ এসে পড়ে। মূল হিমবাহের উপত্যকার গভীরতা উপহিমবাহ অপেক্ষা অনেক বেশি হয়। হিমবাহ অপসারিত হলে উপহিমবাহের উপত্যকাগুলি মূল হিমবাহের উপর ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে বলে মনে হয়, একে ঝুলন্ত উপত্যকা বলে। বদ্রীনাথ এর কাছে ঋষি গঙ্গা একটি ঝুলন্ত উপত্যকা।

7.রসে মতানে:
হিমবাহের প্রবাহপথে অবস্থিত কঠিন শিলাগঠিত ঢিপির প্রতিবাত ঢাল ঘর্ষনের মাধ্যমে মসৃণ হয় এবং অনুবাত ঢাল উৎপাটনের মাধ্যমে এবড়োখেবড়ো, খাঁজকাটা ও অমসৃণ হয়। এই প্রকার ভূমিরূপকে রসেমতানে বলে। উদাহরণ- কাশ্মীর উপত্যকার ঝিলাম নদীর উপনদী লিডারের উপত্যাকাতে রসে মতানে দেখা যায়।

8.ক্র্যাগ ও টেল:
হিমবাহের প্রবাহপথে প্রথমে কঠিন শিলা ও পরে কোমল শিলা অবস্থান করলে কোমল শিলা সরাসরি ক্ষয় এর হাত থেকে রক্ষা পেয়ে কঠিন শিলার পেছনে লেজের মতো অবস্থান করে। এইরূপ ভূমিরূপকে ক্র্যাগ ও টেল বলে।

9.ফিয়র্ড:
ফিয়র্ড হল হিমবাহ কর্তিত উপত্যাকা যা সমুদ্রের জল দ্বারা প্লাবিত হয়ে সমুদ্রতলে অবস্থান করে। এর প্রান্তভাগে চৌকাঠের ন্যায় একটি অংশ উপস্থিত থাকে। এর উর্ধাংশে বরফের গভীরতা বেশি থাকায় ক্ষয় পরিমাণ বেশি। উদাহরণ-নরওয়ের সোজনে ফিয়র্ড পৃথিবীর গভীরতম ফিয়র্ড।



হিমবাহের সঞ্চয় কার্যের ফলে গঠিত ভূমিরূপ:

1.গ্রাবরেখা:
উচ্চ পার্বত্য হিমবাহের সঞ্চয়কার্যের ফলে সৃষ্ট প্রধান ভূমিরূপ হল গ্রাবরেখা। উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল থেকে ক্ষয়জাত নুড়ি, পাথর, শিলাখণ্ড প্রভৃতি হিমবাহ দ্বারা বাহিত হয়ে বিভিন্নভাবে জমা হয়ে যে ভূমিরূপ সৃষ্টি করে, তাকে গ্রাবরেখা বলে। অবস্থান ও প্রকৃতি অনুসারে গ্রাবরেখাকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- 
a.প্রান্ত গ্রাবরেখা 
b.ভূমি গ্রাবরেখা
c.পার্শ্ব গ্রাবরেখা 
d.মধ্য গ্রাবরেখা
e.হিমাবদ্ধ গ্রাবরেখা 
f.হিমতল গ্রাবরেখা প্রভৃতি।

পার্শ্ব গ্রাবরেখা:
হিমবাহের পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের ঢাল থেকে আবহবিকারজাত পদার্থ, তুষারপাতজাত পদার্থ প্রভৃতি হিমবাহের দু'পাশে সঞ্চিত হয়ে পার্শ্ব গ্রাবরেখা সৃষ্টি হয়।
মধ্য গ্রাবরেখা:
দুটি পার্শ্ব গ্রাবরেখা পরস্পর সংযুক্ত হয়ে মধ্য গ্রাবরেখা গঠন করে।
প্রান্ত গ্রাবরেখা:
হিমবাহের সম্মুখভাগে সঞ্চিত গ্রাবরেখাকে প্রান্ত গ্রাবরেখা বলে। তিস্তা নদীর উচ্চ অববাহিকা লাচুং ও লাচেন নামক স্থানে বিভিন্ন প্রকার গ্রাবরেখা লক্ষ্য করা যায়।

বহিঃধৌত সমভূমি:
হিমবাহ পার্বত্যপ্রবাহ থেকে পর্বত পাদদেশে নেমে এসে গলে গেলে ওই হিমবাহবাহিত নুরি,পাথর, কাদা প্রভৃতি একত্রে সঞ্চিত হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সমভূমি সৃষ্টি করে, একে বহিঃধৌত সমভূমি বলে। উদাহরণ: আইসল্যান্ডের দ্বীপে বহিঃধৌত সমভূমি দেখা যায়। যার স্থানীয় নাম Sundur।

ড্রামলিন:
হিমবাহ বাহিত নুড়ি, পাথর প্রভৃতি পর্বত পাদদেশে সঞ্চিত হয়ে উল্টানো চামচ বা উল্টানো নৌকার মতো এক প্রকার ঢেউ খেলানো ভূমিরূপ সৃষ্টি করে, এদের ড্রামলিন বলে। অনেকগুলি ড্রামলিন একসঙ্গে অবস্থান করলে অঞ্চলটি ডিম ভর্তি ঝুড়ির মত হয় বলা হয়। তাই এই ভূমিরূপকে  Busket of Eggs Relief।  একটি আদর্শ ড্রামলিনের দৈর্ঘ্য 1 থেকে 2 কিমি, প্রস্থ 400 থেকে 600 মিটার এবং উচ্চতা 15 থেকে 30 মিটার হয়। উদাহরণ- আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরে, ইংল্যান্ডের উত্তরে, আয়ারল্যান্ডের উত্তরে প্রভৃতি স্থানে ড্রামলিন দেখতে পাওয়া যায়।

কেম:
নিশ্চল বা গতিহীন হিমবাহের পার্শ্বদেশ বরাবর দুটি নদী প্রবাহিত হয় । এই নদী দ্বারা হিমবাহ উপত্যকার পার্শ্বদেশে সঞ্চিত পিন্ডাকৃতি ঢিবিকে কেম বলে। কেম গুলি পরস্পর যুক্ত হয়ে হিমবাহের দুপাশে মঞ্চের আকারে অবস্থান করলে তাদের কেমমঞ্চ বলে। উদাহরণ-স্কটল্যান্ড এর ল্যামারমুয়ার হিমবাহ উপত্যকায় কেম ও কেমমঞ্চের সৃষ্টি হয়েছে।

এসকার:
অনেক সময় পাদদেশীয় হিমবাহের তলদেশের অংশ গলে গিয়ে হিমবাহের তলদেশে সুরঙ্গ সৃষ্টি করে এবং তার মধ্যে তার মধ্য দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়। এই জলধারা সুড়ঙ্গের মধ্যে নুড়ি, বালি, কাদা, শিলাখণ্ড প্রভৃতি জমা করে অনুচ্চ, আঁকাবাঁকা, দীর্ঘ শৈলশিরার মতো ভূমি তৈরি করে, একে এসকার বলে। এর উচ্চতা গড়ে 3 থেকে 5 মিটার এবং দৈর্ঘ্য কয়েক কিমি পর্যন্ত হয়। উদাহরণ- এটি আয়ারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড স্থানে দেখা যায়।

কেটল্:
অনেক সময় যখন হিমবাহের পশ্চাদপসরণ ঘটতে থাকে তখন কোথাও কোথাও গভীর গর্ত ইত্যাদির মধ্যে নিশ্চল হিমরাশি রয়ে যায় এবং অনুবাহ বা ঢিলের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে যায় বা চাপা পড়ে যায়। পরবর্তীকালে সেই নিশ্চল হিমরাশি গলে গলে সেখানে গর্ত থেকে যায় ও হ্রদের সৃষ্টি হয়। এরূপ হ্রদকে কেটল্ হ্রদ বলে এবং গর্ত কি বলে কেটল্। উদাহরণ: উত্তর ইউরোপের অনেক স্থানে নব ও কেটলের অবস্থান লক্ষ্য করা যায় এবং ওই সব অঞ্চলের ভূমিরূপকে নব ও কেটল্ সমন্বিত ভূমিরূপ বলা হয়‌

Friday, October 23, 2020

নদীর ক্ষয়কার্য বা সঞ্চয় কার্য

নদীর ক্ষয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ

নদীর ক্ষয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ সমূহ প্রধানত নদীর উচ্চগতিতে পরিলক্ষিত হয় । নদীরখাতের ক্ষয় ও পরিবহন এর ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপকে ক্ষয়জাত ভূমিরূপ বলে। নিম্নে ক্ষয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপগুলি আলোচনা করা হল-

1.'V' আকৃতির উপত্যকা:
আর্দ্র ও আর্দ্রপায় জলবায়ু অঞ্চলে নদীর পার্বত্য প্রবাহের ভূমির ঢাল বেশি থাকায় নদীগুলি প্রবলভাবে নিম্ন ক্ষয় করে এবং বৃষ্টিপাতের প্রভাবে স্বল্প পরিমাণে পার্শ্ব ক্ষয় করে। ফলে নদী উপত্যকা একদিকে গভীর হয়ে ওঠে এবং পূর্বাপেক্ষা চওড়া 'V'আকৃতির উপত্যকা গঠন করে।

2.শৃঙ্খলিত বা আবদ্ধ শৈলশিরা:
কঠিন শিলাকে পরিহার করার জন্য পার্বত্য প্রবাহে নদী ছোট ছোট বাঁক নিয়ে প্রবাহিত হয়। এর ফলে পরপর দুটি বাঁকের সমস্ত স্পারগুলিকে একসঙ্গে দেখা যায় না।এই প্রকার ভূমিরূপ কে শৃঙ্খলিত শৈলশিরা বলে ।উদাহরণ: তিস্তা নদী পার্বত্য অংশে এই ভূমিরূপ দেখা যায়।

3.গিরিখাত:
উচ্চগতিতে নদীর প্রবলবেগে প্রবাহিত হওয়ায় পার্শ্বক্ষয়ের তুলনায় নিম্ন ক্ষয় অধিক হয়। এরফলে নদীখাত খাড়া V বা l আকৃতির হয় এবং নদী প্রায় সোজা পথে প্রবাহিত হয়। পার্বত্য অঞ্চলের এইরূপ গভীর ও সংকীর্ণ নদী উপত্যকাকে গিরিখাত বলে ।উদাহরণ: পৃথিবীর গভীরতম গিরিখাত নেপালের কালী নদীর উপর অবস্থিত কালীগণ্ডকী গিরিখাত (5571 মিঃ) এবং শতদ্রু, সিন্ধু নদীতে এরূপ একাধিক গিরিখাত দেখা যায়।

4.ক্যানিয়ন:
পার্বত্য অঞ্চলের গিরিখাত এর মতই সূক্ষ্ম মরু অঞ্চলে যে ইংরেজি I আকৃতির খাড়া উপত্যকা সৃষ্টি হয় তাকে ক্যানিয়ন বলে ।
উদাহরণ: আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার কলোরাডো নদীর গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন পৃথিবীর দীর্ঘতম ক্যানিয়ন (483 কিমি দীর্ঘ, সর্বাধিক গভীরতা প্রায় 1600মি)। পেরু দেশের কলকা নদীর এল ক্যানন দা কলকা পৃথিবীর গভীরতম(4375মি) ক্যানিয়ন।

5.খরস্রোত:
নদীর পার্বত্য প্রবাহে প্রচন্ড ঢাল সম্পন্ন জলপ্রপাতে যখন বিপুল পরিমাণ জলরাশি প্রবাহিত হয় তখন তাকে খরস্রোত বলে।
উদাহরণ: আফ্রিকার জাইরে নদীতে পরপর 32 টি খরস্রোতের সৃষ্টি হয়েছে।

6.জলপ্রপাত:
উচ্চগতিতে নদীর তলদেশের হঠাৎ বিচ্যুত হলে বিচ্যুতি তলের উপর থেকে জলরাশি নিচে পতিত হয়, একে জলপ্রপাত বলে। কঠিন ও কোমল শিলা পাশাপাশি অবস্থান করলে এইরূপ জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলার রিও করোনি নদীর এঞ্জেল জলপ্রপাত পৃথিবীর উচ্চতম জলপ্রপাত(উচ্চতা979 মি) । ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের ভারাহি নদীর ওপর কুঞ্চিকল জলপ্রপাত(455মি) হলো ভারতের উচ্চতম জলপ্রপাত।

7.প্রপাত কূপ:
জলপ্রপাতের পাদদেশে সৃষ্ট ঘূর্ণাবর্তের মধ্যস্থিত নুড়ি বা শিলা পাক খেতে খেতে ঘর্ষণের ফলে ভূমি শিলায় যে গর্তের সৃষ্টি করে তাকে প্রপাতকূপ বলে।

8.মন্থকূপ:
প্রবল বেগে প্রবাহিত নদীর তলদেশ বা পার্শ্ব দেশে জলাবতের সৃষ্টি হলে সেখানে নুরি বা শিলার  ঘর্ষণের ফলে যে গর্তের সৃষ্টি হয়, তাকে মন্থকূপ বলে। 

নদীর সঞ্চয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ

ভূমির ঢাল কমে গেলে নদীর মধ্যগতি নিম্নগতি তে নদীবাহিত পলি বালিগাদা নোবিপ্রবি সঞ্চিত হয়ে বিভিন্ন প্রকার সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ গড়ে তোলে

1.পলোল ব্যজনী:
পার্বত্য প্রবাহ থেকে যখন নদী সমভূমিতে পতিত হয় তখন নদীর বহন ক্ষমতা হঠাৎ হ্রাস পাওয়ায় নদীবাহিত পলি, বালি, নুড়ি প্রভৃতি পর্বতের পাদদেশে শঙ্কুর মত জমা হয়। একে বলে পলল শঙ্কু। পাশাপাশি কয়েকটি পলল শঙ্কুর মিলিত হয়ে পলিমঞ্্চ্চচ গঠন করে। যখন সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয় তখন তাকে পলোল শঙ্কুর আকৃতি হয় একে একই পলোল ব্যজনী বা পলল পাখা বলে এর উচ্চতা কল শংকর অপেক্ষা কম হয় যে নদীর জলপ্রবাহ বেশি কিন্তু পরিমাণ কম সেই নদীতে সৃষ্টি হয় উদাহরণ হিমালয় আন্দিজ রকি ইত্যাদি পর্বতের পাদদেশে নদীতে পলোল ব্যজনী সৃষ্টি হয়েছে

2.নদী বাঁক বা মিয়েন্ডার:
মধ্য ও নিম্নপ্রবাহে নদীর গতিবেগ কম থাকায় সামান্য বাধার সম্মুখীন হলে নদীর গতিপথের পরিবর্তন ঘটায় এবং এঁকে বেঁকে প্রবাহিত হয়, একে নদী বাঁক বলে ।
তুরস্কের আঁকাবাঁকা নদী মিয়েন্ডারেস নাম অনুসারে এই ভূমিরূপ এর নাম হয়েছে মিয়েন্ডার। সমভূমি অঞ্চলেে নদীর গতিপথে পলোল অবক্ষেপণ এর ফলে নদীর গতি ধীর হয়ে যায় এবং নদীপথ বেঁকে যায়। নদীর বিকেে যাওয়া অংশে অতিরিক্ত ক্ষয়়় এর ফলে খাড়া পাড়ের সৃষ্টি হয় ।খাড়া পাড়ের বিপরীত দিকে নদী  স্রোতের বেগ কম থাকায়়় সঞ্চয় কার্য ঘটতে থাকে। ফলে সেখাানে ঢালু পাড়ের  সৃষ্টিি হয় । উদাহরণ- গঙ্গা নদীতে এবং নদীয়া জেলার জলঙ্গি নদীতে অসংখ্য নদীবাঁক দেখা যায়। 

3.অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ
 নিম্নপ্রবাহে আঁকাবাঁকা পথে প্রবাহিত নদী বাঁক -এর বাইরের পাড়টি ক্ষয়প্রাপ্ত হয় ও বাঁকের অভ্যন্তরীণ পাড়টিতে পলি সঞ্চিত হয়়। এর ফলে নদীর বাঁক আরোও বাড়তে থাকে এবং একসময় দুটি বাঁক পৃথককারী বাঁকের গ্রীবা অংশটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ঘোড়ার ক্ষষুরের মত একটি অংশ নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ও মূল নদীটি  সোজাপথে প্রবাহিত হয়। এই প্রকার ঘোড়ার খুরের মত বিচ্ছিন্ন অবরুদ্ধ হদকে  অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ বলে। এই ভূমিরূপটি মূলত নদীর ক্ষয়, বহন ও অবক্ষেপণ এর মিলিত কাজের ফলে সৃষ্টি হয়। উদাহরণ-গঙ্গা নদীর নিম্ন প্রবাহ দেখা যায়। 

4.প্লাবনভূমি:
সমভূমি প্রবাহের সময় নদীখাতের গভীরতা হ্রাস পায়।এই সময় নদীর জল হঠাৎ বৃদ্ধি পেলে (অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে) অতিরিক্ত জল নদীরখাত ছাপিয়ে পার্শ্ববর্তী উপত্যাকা অঞ্চলকে প্লাবিত করে এবং নদীবাহিত পলি, বালি, কাদা পার্শ্ববর্তী এলাকায় জমা হয়ে সমভূমির সৃষ্টি হয়, একে প্লাবনভূমি বলে। উদাহরণ- গঙ্গাা, সিন্ধু প্রভৃতি নদীর সমভূমি প্রবাহে প্লাবনভূমি দেখা যায়়। 

5.স্বাভাবিক বাঁধ:
নদীতে প্লাবন হওয়ার সময় নদীখাতের ঠিক পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সর্বাধিক পরিমাণে পলি জমা হয়। এইভাবে একাধিকবার পলি জমা হতে হতে নদী এবং প্লাবনভূমির মধ্যবর্তী অঞ্চলে একটু বেশি উচ্চতাসম্পন্ন ভূমির সৃষ্টি হয়, একে স্বাভাবিক বাঁধ বলে। 
স্বাভাবিক বাঁধ এর নদীর দিকে ঢাল খাড়া এবং প্লাবনভূমির দিকটি ক্রমশ ঢালু হয়। স্বাভাবিক বাঁধ এর গড় উচ্চতা 2 থেকে 3 মিটার হয়। কিন্তু পো, হোয়াংহো নদীতে 7 থেকে 10 মিটার পর্যন্ত স্বাভাবিক বাঁধ এর উচ্চতা দেখা যায়। মিশরে নীলনদের গতিপথে একাধিক স্বাভাবিক দেখা যায়। 

6.খাঁড়ি:
মোহনার কাছে নদীর স্রোত বেশি হলে অথবা জোয়ার ভাটার প্রকোপ অধিক থাকলে নদীবাহিত পলি, কাদা, বালি প্রভৃতি সঞ্চিত হতে পারে না। এর ফলে নদীর মোহনা যথেষ্ট খোলা ও চওড়া হয়। একে খাঁড়ি বা ফাথ বলা হয়। বর্তমানে সুন্দরবন অঞ্চলের অধিকাংশ নদীগুলি খাঁড়ির অন্তর্গত। উদাহরণ- রাশিয়ার উত্তরাংশে অবস্থিত ওব নদীর মোহনায় অবস্থিত খাঁড়িটি হল পৃথিবীর দীর্ঘতম খাঁড়ি। এর দৈর্ঘ্য প্রায় 885 কিমি এবং এটি প্রায় 80 কিমি চওড়া। 

7.বদ্বীপ:
নদীর মোহনা সংলগ্ন অংশে নদীবাহিত পলি, বালি,কাদা প্রভৃতি সঞ্চিত হয়ে মাত্রাহীন 'ব' কিংবা গ্রিক অক্ষর ডেল্টার ন্যায় অবস্থান করলে, তাকে বদ্বীপ বলে।
     যখন একটি নদী কোনো স্থির জলাশয়ে পতিত হয়ে সেখানে নুড়ি, পলি, বালি, কাদায় সঞ্চয় করে, তাকে বদ্বীপ বলে। 
বদ্বীপ বিভিন্ন প্রকারের হয়। যেমন- ত্রিকোণাকার বদ্বীপ, ধনুকাকৃতি ব-দ্বীপ, পাখির পায়ের আকৃতিবিশিষ্ট বদ্বীপ, হদ বদ্বীপ, সমুদ্র বদ্বীপ প্রভৃতি। উদাহরণ - গঙ্গা-ব্রহ্মপুএ -এর বদ্বীপ পৃথিবীর মধ্যে বৃহত্তম। এছাড়াও হুগলি নদীর মোহনায় সাগরদ্বীপ অন্যতম। 

Thursday, September 10, 2020

নদী-River

নদী(River):
যে  স্বাভাবিক জলধারা তুষারগলা জল বা বৃষ্টির জলে পুষ্ট হয়ে বা প্রস্রবণ থেকে উৎপন্ন হয়ে ভূমির ঢাল অনুসারে প্রবাহিত হয় সাগর, হ্রদ বা অন্য জলধারার সঙ্গে মিলিত হয় তাকে নদী বলে। 
নদী অববাহিকা(River Basin):
কোন সুবিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রধান নদী, শাখানদী, উপনদী, প্রশাখা নদী যে অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, তাকে নদী অববাহিকা বলে। 
জলবিভাজিকা(Interfluves):
যে উচ্চভূমি পাশাপাশি অবস্থিত দুই বা ততোধিক নদী অববাহিকাকে পৃথক করে, তাকে বলে জলবিভাজিকা।হিমালয়, বিন্ধ্্য , সাতপুরা হলো ভারতের গুরুত্বপূর্ণ জলবিভাজিকা। 

নদীর বিভিন্ন গতি:
ভূমির ঢাল, জলের পরিমাণ এবং প্রবাহের বিভিন্নতা অনুযায়ী নদীর গতিপথ বা প্রবাহকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- 
1.উচ্চগতি বা পার্বত্য প্রবাহ
2.মধ্যবর্তী বা সমভূমি প্রবাহ 
3.নিম্নগতি বা  বদ্বীপ প্রবাহ

1.উচ্চগতি বা পার্বত্য প্রবাহ:
উৎস থেকে নদী যতদূর পর্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, তাকে নদীর উচ্চগতির বা পার্বত্য প্রবাহ বলে। 
যেমন- গোমুখ থেকে হরিদ্দার পর্যন্ত গঙ্গার উচ্চগতি বা পার্বত্য প্রবাহ দেখা যায়। 
বৈশিষ্ট্য:
1.উচ্চগতিতে ভূমির ঢাল বেশি থাকে বলে নদী পার্শ্বক্ষয় অপেক্ষা  নিম্নক্ষয় বা নদীর তলদেশে ক্ষয় হয় বেশি হয়। 2.উচ্চগতিতে নদীতে বোঝা কম থাকে এবং নদী ক্ষয়িত পদার্থ বহনও করে। 
3.উচ্চগতিতে নদীর গুলি খরস্রোতা হয় বলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়ক হলেও নৌ-পরিবহনের পক্ষে অনুপযুক্ত। 
সৃষ্ট ভূমিরূপ:
এই গতিতে নদী 'I' ও 'V' আকৃতির উপত্যকা, জলপ্রপাত, গিরিখাত, মন্থকূপ প্রভৃতি ভূমিরূপ সৃষ্টি করে। 
2.মধ্যবর্তী বা সমভূমি প্রবাহ:
উচ্চগতির পরবর্তী ক্ষেত্রে নদী যখন সমভূমিতে নেমে আসে তখন ঢালের পরিবর্তনের কারণে নদীর গতিবেগ কমে যায়, নদীর এই গতিপ্রবাহকে মধ্যগতি বা সমভূমি প্রবাহ বলে। 
যেমন- হরিদ্দার থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান পর্যন্ত গঙ্গানদীর মধ্যগতি বা সমভূমি প্রবাহ। এই প্রবাহপথ হল 900 কিমি। 
বৈশিষ্ট্য:
1.নদী সমভূমিতে নেমে আসে বলে ভূমির ঢাল হঠাৎ করে অনেকটা কমে যায়, ফলে নদীর গতিবেগ হ্রাস পায়। 
2.এই সময় নদী নিম্নক্ষয় অপেক্ষা পার্শ্বক্ষয় বেশি করে, তবে এই গতিতে নদীর প্রধান কাজ বহন। 
3.মধ্যগতিতে প্রধান নদীতে অনেক উপনদী এসে মিলিত হয় বলে জলের পরিমাণ ও নদীবাহিত বোঝার পরিমাণ দুই-ই বৃদ্ধি পায়। 
4.নদী এই সময় জলসেচ ও নৌপরিবহনে সাহায্য করে থাকে। 
সৃষ্ট ভূমিরূপ:
এই গতিতে নদী মিয়েন্ডার, বালুচর, অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ, চওড়া ও অগভীর নদী উপত্যকা প্রভৃতি ভূমিরূপ সৃষ্টি করে। 
3.নিম্নগতি বা  বদ্বীপ প্রবাহ:
মধ্যগতির পরবর্তীতে নদী যখন সমভূমির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে ক্ষয়ের নিম্নসীমার কাছে চলে আসে এবং গতিবেগ ক্রমশ মন্থর হয়, নদীর সেই প্রবাহকে নিম্নগতি বা বদ্বীপ প্রবাহ বলে। 
যেমন- মুর্শিদাবাদ থেকে মোহনা পর্যন্ত প্রায় 250 কিমি গঙ্গা নদীর নিম্ন গতি বা বদ্বীপ প্রবাহ। 
বৈশিষ্ট্য:
1.এ পর্যায়ে ভূমির ঢাল প্রায়ই থাকে না বলে নদী খুবই ধীর গতিসম্পন্ন হয়। 
2.নদী এই সময় শুধু বহন করে, তবে বোঝার পরিমাণ খুব বেশি থাকে বলে প্রধান কাজ সঞ্চয় বা অবক্ষেপণ। 
3.নদী সূক্ষ্ম পলি, বালি, কাদা সঞ্চয় করে নদী মধ্যস্থ চড়া বা বদ্বীপ গঠন করে। 
4.নদীখাত খুবই অগভীর ও চওড়া হয়। 
5.নদী এই সময় জলসেচ ও নৌপরিবহনে সহায়ক হয়। 
সৃষ্ট ভূমিরূপ:
নিম্নগতিতে সঞ্চয়ের মাধ্যমে নদী বিস্তৃত প্লাবনভূমি, স্বাভাবিক বাঁধ, অসংখ্য বদ্বীপ প্রভৃতি গড়ে তোলে। 

নদীর উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত তার দীর্ঘ গতিপথে বিভিন্ন ধরনের কাজ করে। নদীর কাজ প্রধানত তিন ধরনের, যথা- ক্ষয়, বহন ও অবক্ষেপণ। নদীর এই কাজগুলি নির্ভর করে নদীর শক্তির ওপর, যা নির্ভর করে নদীর জলের আয়তন ও পরিমাণ, গতিপথের ঢাল, জলপ্রবাহের গতি এবং বাহিত বস্তুভরের উপর। এইসব অবস্থান নদীর গতিবেগ এর তারতম্য ঘটায় এবং বিভিন্ন কাজকে প্রভাবিত করে। 

নদীর জলপ্রবাহ পরিমাপের একক হল- কিউসেক বা কিউমেক। কিউসেক হলো কিউবিক ফুট/সেকেন্ড এবং কিউমেক হলো কিউবিক মিটার/সেকেন্ড। 

নদীখাতের ক্ষয় ও পরিবহনের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপকে ক্ষয়জাত ভূমিরূপ বলে। নদীর ক্ষয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ সমূহ প্রধানত নদীর উচ্চ গতিতে পরিলক্ষিত হয়। 
যেমন- Vআকৃতির উপত্যকা, গিরিখাত, ক্যানিয়ন, জলপ্রপাত ইত্যাদি। 
ভূমির ঢাল কমে গেলে নদীর মধ্যগতি ও নিম্নগতিতে নদীবাহিত পলি, কাদা, নূরী  প্রভৃতি সঞ্চিত হয়ে বিভিন্ন প্রকার সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ গড়ে তোলে একে সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ বলে। 
যেমন- মিয়েন্ডার, পলল ব্যজনী, অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ, বদ্বীপ ইত্যাদি। 

Saturday, September 5, 2020

বায়ুমণ্ডল

আমরা যেখানে বাস করি সেই পৃথিবীপৃষ্ঠের ওপরে বেষ্টন করে থাকা আবরণী হল বায়ুমণ্ডল, যা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে পৃথিবীর গায়ে চাদরের মতো জড়িয়ে থাকে। পৃথিবীতে জীবের বেঁচে থাকার জন্য যেমন বায়ুমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ তেমনি বায়ুমণ্ডলসহ পৃথিবীর জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষার্থে অন্যান্য উপাদান গুলির সঠিক মাত্রা থাকাও বাঞ্ছনীয়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি কর্তা নিয়ম অনুসারে গ্যাসীয় উপাদানগুলি তাদের ধর্ম অনুযায়ী এক একটি স্তরে সজ্জিত আছে। আর আবহমানকাল ধরে মহাকাশে বিজ্ঞানীরা সেই সৃষ্টিকর্তার রহস্যে মোড়া বায়ুমণ্ডলের স্তর নিয়ে চিরন্তন গবেষণা করে চলছেন। 

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উপরের দিকে প্রায় 10,000 কিমি পর্যন্ত যে অদৃশ্য গ্যাসীয় আবরণ পৃথিবীকে বেষ্টন করে আছে তা হলো বায়ুমন্ডল। এই অদৃশ্য গ্যাসীয় আবরণ পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে জড়িয়ে থাকে এবং পৃথিবীর সঙ্গে আবর্তন করে। 
  পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 10,000 কিমি পর্যন্ত উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত যে অদৃশ্য গ্যাসীয় আবরণ পৃথিবীতে বেষ্টন করে আছে, তাকে বায়ুমণ্ডল বলা হয়। অর্থাৎ পৃথিবী কে বেষ্টনকারী অদৃশ্য গ্যাসীয় আবরণ হল বায়ুমণ্ডল। 

বায়ুমণ্ডল গঠনকারী প্রধান উপাদান গুলি হল-
 1.গ্যাসীয় উপাদান 
2.জলীয়বাষ্প এবং
 3.ধূলিকণা
বায়ুমন্ডলে এই সকল উপাদান এর শতকরা 97 ভাগ পদার্থই সমুদ্রপৃষ্ঠতল থেকে 27 থেকে 30 কিমি মধ্যে অবস্থান করে। 



1.গ্যাসীয় উপাদান:
বায়ুমন্ডলে বিভিন্ন গ্যাসের উপাদান এর মধ্যে প্রধান হল নাইট্রোজেন(2), অক্সিজেন(2) অর্থাৎ, বায়ুমন্ডলের গ্যাসীয় উপাদান এর প্রায় 99 শতাংশ নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন নিয়ে গঠিত। অন্যান্য গ্যাসগুলির মধ্যে আছে আর্গন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, হিলিয়াম, হাইড্রোজেন, ওজোন, নিয়ন, ক্রিপটন, জেননমিথে, মিথেন প্রভৃতি। 

2.জলীয় বাষ্প:
জলের গ্যাসীয় অবস্থাকেই জলীয়বাষ্প বলে।বায়ুমন্ডলের সব স্থানে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ একই থাকে না। উচ্চতা, অক্ষাংশ, উষ্ণতা, স্থলভাগ, ও জলভাগের বন্টন এর তারতম্যের জলীয় বাষ্পের উপস্থিতির তারতম্য ঘটে। মেঘাচ্ছন্নতা, বৃষ্টিপাত, শিশির, তুষারপাত, ঝড় প্রভৃতি দুর্যোগ জলীয়বাষ্পের উপস্থিতির জন্যই সৃষ্টি হয়। 

3.ধূলিকণা:
বায়ুমণ্ডলের আরে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ধূলিকণা যা অ্যারোসল নামে পরিচিত। সমুদ্রতীর অথবা মরু অঞ্চলের সূক্ষ্ম বালিকণা, কলকারখানাযর পোড়া কয়লার ছাই, বিভিন্ন প্রকার অতি সূক্ষ্ম খনিজ লবণ, আগ্নেয়গিরি থেকে উৎক্ষিপ্ত ছাইভস্ম, উল্কার ধ্বংসাবশেষ  প্রভৃতি ধূলিকণা রূপে বায়ুমন্ডলে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। 

উপাদান ও উষ্ণতার ভিত্তিতে বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস:
উপাদানগত তারতম্যের ভিত্তিতে বায়ুমন্ডলকে দুটি'ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-
1.সমমন্ডল ও 2.বিষমমন্ডল
1.সমমন্ডল(Homosphere) :
সমুদ্র সমতল থেকে ঊর্ধ্বে 100 কিমি( মতান্তরে 80-90 কিমি) উচ্চতা পর্যন্ত অংশে বায়ুমণ্ডল গঠনকারী উপাদানগুলির অনুপাত মোটামুটি একই রকম থাকে, তাই এই স্তর সমমন্ডল(Homosphere) নামে পরিচিত। বিশেষত বিভিন্ন প্রকার গ্যাস, জলীয়বাষ্প এবং জৈব ও অজৈব কণিকা দ্বারা এই স্তরটি গঠিত। এই অঞ্চলের প্রকৃতিই পৃথিবীর জলবায়ু নির্ধারণ করে। 
2.বিষমমন্ডল(Heterosphere):
হোমোস্ফিয়ার বা সম মন্ডলের ঊর্ধ্বে প্রায় 100 কিলোমিটার থেকে 10000 কিলোমিটার পর্যন্ত অংশে বায়ুমণ্ডল গঠনকারী উপাদানগুলির অনুপাত একই রকম থাকে না এবং বিভিন্ন গ্যাসের স্তরগুলির মধ্যে বিভিন্নতা দেখা যায়। তাই এই স্তর বিষমমন্ডল(Heterosphere) নামেে পরিচিত।  বিশেষত  এই স্তরটিতে আণবিক ওজন অনুসারে প্রথমে ভারী গ্যাস এবং ধীরে ধীরে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হালকা গ্যাস অবস্থান করে। এই অঞ্চল চারটি স্তরে বিভক্ত। যথা-
1.আণবিক নাইট্রোজেন স্তর (100-200 কিমি) 
2.পরমানবিক অক্সিজেন স্তর(201-1000 কিমি) 
3. হিলিয়াম স্তর (1001-2000 কিমি) 
4. হাইড্রোজেন স্তর (3500-10000 কিমি) 


উষ্ণতার ভিত্তিতে বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস:
উষ্ণতার তারতম্যের ভিত্তিতে বায়ুমন্ডলকে 6 টি ভাগে ভাগ করা যায়। 
1.ট্রপোস্ফিয়ার 
2.স্ট্রাটোস্ফিয়ার 
3.মেসোস্ফিয়ার 
4.আয়নোস্ফিয়ার 
5.এক্সোস্ফিয়ার 
6.ম্যাগনেটোস্ফিয়ার

1.ট্রপোস্ফিয়ার:
এটি বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে নীচের ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন স্তর যেখানে বায়ুমণ্ডলের যাবতীয় পরিবর্তন দেখা যায়। 
বিস্তার:
এই স্তর নিরক্ষীয় অঞ্চলে 18 কিমি, ক্রান্তীয় অঞ্চলে 12.5 কিমি এবং মেরু অঞ্চলে প্রায় 8 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। 
বৈশিষ্ট্য:
1.এই স্তরে প্রতি 1000 মিটার উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে 6.4°C হারে উষ্ণতা হ্রাস পায়, একে স্বাভাবিক উষ্ণতা হ্রাস হার ( Normal Lapse Rate) বলে।
2.বায়ুমণ্ডলের 75 শতাংশ গ্যাসীয় উপাদান(N2, O2, CO2) এই স্তরে অবস্থিত।
 3.বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ (বজ্র, বিদ্যুৎ, ঝড়, বৃষ্টি) এই স্তরে দেখা  যায় , তাই একে ক্ষুব্ধমন্ডল বলা হয় । ট্রপোস্ফিয়ার উর্ধ্বসীমাকে ট্রপোপজ বলা হয় ।(ট্রপোস্ফিয়ার ও স্ট্রাটোস্ফিয়ার এর মধ্যবর্তী সংযোগকারী স্তর হল ট্রপোপজ)

2.স্ট্রাটোস্ফিয়ার:
ট্রপোস্ফিয়ারের উর্ধ্বসীমা ট্রপোপজের ওপরে বায়ুমণ্ডলের স্তর স্ট্রাটোস্ফিয়ার নামে পরিচিত। 
বিস্তার: 
ট্রপোপজ এর ওপর থেকে অর্থাৎ প্রায় 20 কিমি থেকে 50 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। 
বৈশিষ্ট্য:
1. এই স্তরে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং এর সর্বোচ্চ উচ্চতায় (50 কিমি) তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে 0°C  পৌছায়। 
2. স্তরটিতে জলীয় বাষ্প ও মেঘ না থাকায় কোনো প্রকার বায়বীয় গোলযোগ ঘটে না অর্থাৎ আবহাওয়া শান্ত থাকে তাই একে শান্তমন্ডল বলা হয়। 
3.এই স্তরে 20 থেকে 35 কিমি উচ্চতায় ওজোন(3) গ্যাসের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়, তাই এই অংশকে ওজনোস্ফিয়ার বলে। এই গ্যাস ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে উত্তপ্ত হয় বলেই এই অংশের উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়।
4.এই স্তরের উর্ধ্বসীমাকে অর্থাৎ স্ট্রাটোস্ফিয়ার ও মেসোস্ফিয়ার এর মধ্যবর্তী সংযোগকারী সীমানাকে  স্ট্যাটোপজ বলে। 

3.মেসোস্ফিয়ার:
স্ট্যাটোপজের ওপরে স্তরটিকে মেসোস্ফিয়ার বলা হয় । বিস্তার:
স্ট্যাটোপজের ওপর থেকে প্রায় 80 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত। বৈশিষ্ট্য:
1.উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই স্তরে উষ্ণতা অতি দ্রুত হারে কমতে থাকে।
2.মেসোস্ফিয়ার এর বায়ুচাপ খুবই কম । 
3.উল্কাপিণ্ড সমূহ এই স্তরে এসে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। 4.এই স্তরের উর্ধ্বসীমাকে অর্থাৎ মেসোস্ফিয়ার ও আয়নোস্ফিয়ার এর মধ্যবর্তী সংযোগকারী সীমানাকে মেসোপজ বলে। 

4.আয়োনোস্ফিয়ার:
মেসোপজের ঊর্ধ্বে বায়ুমণ্ডলের চতুর্থ স্তরটিকে আয়নোস্ফিয়ার বলে। 
বিস্তার:
মেসোপোজের উর্ধে অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠের 80 কিমি উচ্চতা থেকে 500 কিমি উচ্চতার মধ্যবর্তী অংশে এই স্তরটি অবস্থিত । 
বৈশিষ্ট্য:
1.এই স্তরে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণতা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং অতিবেগুনী ও  X-রশ্মি শোষিত হওয়ার কারণে সর্বোচ্চ অংশের উষ্ণতা প্রায় 1200° C পৌঁছায়।2. এই স্তরে  বস্তুকণা আয়নিত অবস্থায় থাকে বলে বেতার তরঙ্গ এখান থেকে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসে। 
3. এই স্তরের নিম্নাংশের বায়োবীয় উপাদানগুলি সূর্য রশ্মির তেজস্ক্রিয় ক্ষুদ্র তরঙ্গ দ্বারা ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আয়নে ভেঙে যায়। তাই একে আয়নোস্ফিয়ার বলে। 

5.এক্সোস্ফিয়ার:
আয়োনোস্ফিয়ার বা থার্মোস্ফিয়ার এর ওপরের স্তরটিকে এক্সোস্ফিয়ার বলা হয়। 
বিস্তার:
এই স্তর থার্মোস্ফিয়ার এর ওপরে অর্থাৎ 500 থেকে 750 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। 
বৈশিষ্ট্য:
1.এই স্তরে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়
 (1200°- 1600°C)
2. এই স্তরে  হিলিয়াম ও হাইড্রোজেন গ্যাসের প্রাধান্য দেখা যায়। 

6.ম্যাগনেটোস্ফিয়ার:
এক্সোস্ফিয়ারের ঊর্ধ্বে বায়ুমণ্ডলের সর্বোচ্চ স্তর তথা শেষ সীমাকে ম্যাগনেটোস্ফিয়ার বলা হয়। 
বিস্তার:
এই স্তরটি এক্সোস্ফিয়ার এর ঊর্ধ্বে অর্থাৎ 750 কিমি থেকে প্রায় 10,000 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। 
বৈশিষ্ট্য:
1.এই স্তরে সমস্ত বায়োবীয় উপাদান আয়নিত অবস্থায় থাকে এবং এখানকার উষ্ণতা প্রায় 2000°C । 
2. এই স্তরে প্রোটন ও ইলেকট্রন এর সমন্বয়ে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে, তাই একে ম্যাগনেটোস্ফিয়ার বলা হয়। 

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়: ১.ভূমিক্ষয় রোধ করা: মরু প্রান্তীয় এলাকায় মাটি ক্ষয় রোধ করতে ঢালু এলাকায় সমোন্নতিরেখা চাষ, বায়ুরোধক দেয়া...