Sunday, August 16, 2020

জলদূষণ (Water pollution)

জলদূষণ(Water pollution)

জলে বিভিন্ন অবাঞ্ছিত রাসায়নিক বা জৈব পদার্থ, জীবাণু মিশে গিয়ে জল মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেলে এবং জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে গেলে জল দূষিত হয়।
 
তোমরা বাড়ির অ্যাকোরিয়ামের জলে যদি কোনও ভাবে একটু ফিনাইল বা কেরোসিন তেল মিশে যায়, তবে কি মাছগুলো আর বেঁচে থাকবে? দেখবে কিছুদিনের মধ্যে মাছ গুলো সব মারা যাবে। 



জলদূষণের কারণ(Causes of water pollution):-

1.শিল্প কলকারখানা থেকে জল দূষণ:
পেট্রো-রাসায়নিক শিল্পে, পলিথিন-প্লাস্টিক শিল্পে, জ্বালানি শিল্পে খনিজ তেল পরিশোধন শিল্পে, বিভিন্ন রকম যানবাহন নির্মাণ, ছোট ও মাঝারি ইলেকট্রিক্যাল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পে প্রচুর পরিমাণে দূষিত রাসায়নিক পদার্থ, যেমন- অ্যামোনিয়া, ক্লোরিন, ফেনল, এবং বিভিন্ন ধাতু, জিংক, পারদ, সিসা, ক্রোমিয়াম ঘটিত দূষক নালা, নর্দমা দিয়ে নদী বা সমুদ্রের জলে মিশে জল দূষণ করছে। 
2.গৃহস্থালি থেকে জলদূষন:
গ্রাম এবং শহর এলাকার বিভিন্ন আবর্জনা ও বর্জ্য পদার্থ যেমন গৃহস্থালির দৈনন্দিন রান্না খাবারের টুকরো, দূষিত বস্তু, শৌচাগারের মলমূত্র, সাবান, ডিটারজেন্ট, ফিনাইল প্রভৃতি নিকাশি নালার মাধ্যমে ভূগর্ভের জলে, নদীতে, জলাশয়ে পড়ে জলকে দূষিত করে তোলে । এছাড়াও বিভিন্ন পশুশালা, বড়বাজার, হাসপাতাল, চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে উৎপন্ন জলকে দূষিত করে। 
3.কৃষি ক্ষেত্র থেকে জলদূষন:
চাষের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক সার, কীটনাশক , আগাছানাশক ব্যবহার করা হয়। বৃষ্টির জলে ধুয়ে এই সমস্ত বিষাক্ত রাসায়নিক ভূগর্ভের জলে, জলাশয়ে, নদীতে মিশে জল দূষিত করে। এই সারে থাকা নাইট্রেট এর কারণে ক্যান্সার হতে পারে । শিশুদের মাথায় রক্ত চলাচলে অসুবিধা ঘটায়। 
4.তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে দূষণ:
পারমাণবিক চুল্লি, চিকিৎসাকেন্দ্র বা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা গারে ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় পদার্থ গুলো ব্যবহারের পর সমুদ্র বা নদীতে ফেলা হয়। পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর তেজস্ক্রিয় পদার্থ জলে মিশে জল দূষণ ঘটায়। 
5.খনিজ তেল থেকে দূষণ:
দুর্ঘটনাগ্রস্ত তেলবাহী জাহাজ থেকে অথবা সমুদ্র অবস্থিত তেলের খনির তেল সমুদ্রে মিশে জল দূষণ ঘটায়। 
6.তাপীয় দূষণ:
তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, পারমাণবিকবিদ্যুৎ কেন্দ্র , কলকারখানায় ব্যবহৃত উষ্ণ দূষিত বজ্য জল সরাসরি জলাশয়ে, নদীতে নিচে জলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দেয় ও জল দূষণ ঘটায়। 
7.বায়ু দূষণের কারণে জল দূষণ:
কলকারখানা এবং যানবাহনের ধোঁয়া মাধ্যমে বাতাসে সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, কার্বন মনো অক্সাইড ইত্যাদি জমা হয়। বৃষ্টির জলের সঙ্গে সালফার-ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রজেন-ডাই-অক্সাইড বিক্রিয়া করে। বিভিন্ন জলাশয়ে জলকে আম্লিক করে দেয়। 
8.আর্সেনিক দূষণ:
মাটির নিচের স্তর থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে অতিরিক্ত জল তুলে নেওয়ার যোগ হলে ফলে মাটির নিচে ফাঁকা জায়গায় আর্সেনিকের যৌগ বাতাসের সঙ্গে বিক্রিয়া করে বিষাক্ত যৌগ তৈরি করে। এই যৌগ জলে মিশে নলকূপের জলের মাধ্যমে পানীয় জলে মিশে যায়, জলে ফ্লুওরিনের যৌগ, ক্লোরিন অতিরিক্ত পরিমাণে থাকলেও জল দূষিত হয়। 

জলদূষণের প্রভাব(Impact of water pollution) :-

1.1932 জাপানে মিনামাটা উপসাগরের উপকূলে একটা রাসায়নিকের কলকারখানা থেকে পারদযুক্ত তরল বজ্র সমুদ্রে ফেলা হয়। এই মারাত্মক পারদ দূষণে প্রায় 30 বছর ধরে অসংখ্য মানুষ এবং জীব জন্তু মারা যায়। 
2.উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় কুয়েতে প্রচুর তেলের কূপ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। প্রচুর পরিমাণে খনিজ তেল পারস্য উপসাগরের জলে মিশে অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যু হয়। 
3.হলদিয়া পেট্রোরসায়ন শিল্প গড়ে ওঠার পর থেকে হলদি নদীর মোহনায় ইলিশ মাছের আনাগোনা কমে গেছে। 
4.সাবান, ডিটারজেন্ট ফসফেট বদ্ধ পুকুর, জলাশয়ের জলে মিশলে প্রচুর পরিমাণে শৈবাল, আগাছা, কচুরিপানা বেড়ে যায়। এর ফলে জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গিয়ে মাছ ও জলজ প্রাণীরা মারা যায়। একে ইউট্রোফিকেশন বলে। 
5.পশ্চিমবঙ্গের মালদা, নদিয়া, হুগলি, হাওড়া, বর্ধমান ও দক্ষিণ 24 পরগনা জেলার মাটির নিচের জলে অনেক বেশি মাত্রায় আর্সেনিক রয়েছে। এরফলে হাতের চেটো পায়ের তলায় যে কালো কালো ক্ষত হয়, তাকে ব্ল্যাকফুট ব্যাধি বলে। এছাড়াও চর্মরোগ, রক্তাল্পতা, যকৃত, ফুসফুস, ত্বকের ক্যান্সার হতে পারে। ফ্লুরাইড দূষণ থেকে ফ্লুরোসিস, দাঁত , হাড়ের সমস্যা, পারদ দূষণে মিনামাটা, ক্যাডমিয়াম দূষণের ইতাই-ইতাই অসুখ হয়। 

জলদূষণ প্রতিরোধ(Water pollution prevention):-

জলদূষণ আটকানোর সঙ্গে সঙ্গে জলের অতিরিক্ত ব্যবহার কমানো এবং বেশি পরিমাণে পুনর্ব্যবহার করলে তবেই সারা পৃথিবীব্যাপী তীব্র জল সংকট মেটানো যেতে পারে। 
1.জলাশয়, নদী বা সমুদ্রের জলে নোংরা আবর্জনা সরাসরি  ফেলা যাবে না, গরু-মোষ স্নান করানো, কাপড় কাচা বন্ধ করতে হবে। 
2.চাষের ক্ষেতে অতিরিক্ত সার, কীটনাশক দেওয়া বন্ধ করতে হবে। 
3.শহর এবং কলকারখানার দূষিত বর্জ্য জল শোধন করে তবেই নদী বা সমুদ্রের ফেলা উচিত। ব্যবহার করা জল পরিশোধন করে পুনর্ব্যবহার করতে হবে। 
4.তাপবিদ্যুৎ, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য গরম জল ঠান্ডা করে তবেই নদী বা সমুদ্রে ফেলা উচিত। 
5.বিভিন্ন রকম ব্যাকটেরিয়া, শৈবাল এবং রাসায়নিকের মাধ্যমে সমুদ্রে ভাসমান তেলর দূষণ দূর করা যায়। 
6.নিরাপদ পানীয় জলের জন্য নলকূপের জলদূষণের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করে, বিশুদ্ধ জল সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। 
7.দরকার না থাকলে জলের কল বন্ধ করে রাখতে হবে। এতে একদিকে যেমন বিশুদ্ধ জল নষ্ট হবেনা। অন্যদিকে দূষিত জলের পরিমাণও কমবে। 
8.পরিবেশের ক্ষতি করবে না এরকম জিনিস (যেমন কম ক্ষার বা ক্ষারহীন সাবান, শ্যাম্পু, ডিটারজেন্ট) ব্যবহার করতে হবে। 
9.বাড়ির নোংরা আবর্জনা, তরল বজ্র এমন জায়গায় ফেলা উচিত যাতে কোনোভাবে তা বিশুদ্ধ জলের সঙ্গে  না মিশে। 


No comments:

Post a Comment

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়: ১.ভূমিক্ষয় রোধ করা: মরু প্রান্তীয় এলাকায় মাটি ক্ষয় রোধ করতে ঢালু এলাকায় সমোন্নতিরেখা চাষ, বায়ুরোধক দেয়া...