Friday, October 23, 2020

নদীর ক্ষয়কার্য বা সঞ্চয় কার্য

নদীর ক্ষয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ

নদীর ক্ষয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ সমূহ প্রধানত নদীর উচ্চগতিতে পরিলক্ষিত হয় । নদীরখাতের ক্ষয় ও পরিবহন এর ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপকে ক্ষয়জাত ভূমিরূপ বলে। নিম্নে ক্ষয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপগুলি আলোচনা করা হল-

1.'V' আকৃতির উপত্যকা:
আর্দ্র ও আর্দ্রপায় জলবায়ু অঞ্চলে নদীর পার্বত্য প্রবাহের ভূমির ঢাল বেশি থাকায় নদীগুলি প্রবলভাবে নিম্ন ক্ষয় করে এবং বৃষ্টিপাতের প্রভাবে স্বল্প পরিমাণে পার্শ্ব ক্ষয় করে। ফলে নদী উপত্যকা একদিকে গভীর হয়ে ওঠে এবং পূর্বাপেক্ষা চওড়া 'V'আকৃতির উপত্যকা গঠন করে।

2.শৃঙ্খলিত বা আবদ্ধ শৈলশিরা:
কঠিন শিলাকে পরিহার করার জন্য পার্বত্য প্রবাহে নদী ছোট ছোট বাঁক নিয়ে প্রবাহিত হয়। এর ফলে পরপর দুটি বাঁকের সমস্ত স্পারগুলিকে একসঙ্গে দেখা যায় না।এই প্রকার ভূমিরূপ কে শৃঙ্খলিত শৈলশিরা বলে ।উদাহরণ: তিস্তা নদী পার্বত্য অংশে এই ভূমিরূপ দেখা যায়।

3.গিরিখাত:
উচ্চগতিতে নদীর প্রবলবেগে প্রবাহিত হওয়ায় পার্শ্বক্ষয়ের তুলনায় নিম্ন ক্ষয় অধিক হয়। এরফলে নদীখাত খাড়া V বা l আকৃতির হয় এবং নদী প্রায় সোজা পথে প্রবাহিত হয়। পার্বত্য অঞ্চলের এইরূপ গভীর ও সংকীর্ণ নদী উপত্যকাকে গিরিখাত বলে ।উদাহরণ: পৃথিবীর গভীরতম গিরিখাত নেপালের কালী নদীর উপর অবস্থিত কালীগণ্ডকী গিরিখাত (5571 মিঃ) এবং শতদ্রু, সিন্ধু নদীতে এরূপ একাধিক গিরিখাত দেখা যায়।

4.ক্যানিয়ন:
পার্বত্য অঞ্চলের গিরিখাত এর মতই সূক্ষ্ম মরু অঞ্চলে যে ইংরেজি I আকৃতির খাড়া উপত্যকা সৃষ্টি হয় তাকে ক্যানিয়ন বলে ।
উদাহরণ: আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার কলোরাডো নদীর গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন পৃথিবীর দীর্ঘতম ক্যানিয়ন (483 কিমি দীর্ঘ, সর্বাধিক গভীরতা প্রায় 1600মি)। পেরু দেশের কলকা নদীর এল ক্যানন দা কলকা পৃথিবীর গভীরতম(4375মি) ক্যানিয়ন।

5.খরস্রোত:
নদীর পার্বত্য প্রবাহে প্রচন্ড ঢাল সম্পন্ন জলপ্রপাতে যখন বিপুল পরিমাণ জলরাশি প্রবাহিত হয় তখন তাকে খরস্রোত বলে।
উদাহরণ: আফ্রিকার জাইরে নদীতে পরপর 32 টি খরস্রোতের সৃষ্টি হয়েছে।

6.জলপ্রপাত:
উচ্চগতিতে নদীর তলদেশের হঠাৎ বিচ্যুত হলে বিচ্যুতি তলের উপর থেকে জলরাশি নিচে পতিত হয়, একে জলপ্রপাত বলে। কঠিন ও কোমল শিলা পাশাপাশি অবস্থান করলে এইরূপ জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলার রিও করোনি নদীর এঞ্জেল জলপ্রপাত পৃথিবীর উচ্চতম জলপ্রপাত(উচ্চতা979 মি) । ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের ভারাহি নদীর ওপর কুঞ্চিকল জলপ্রপাত(455মি) হলো ভারতের উচ্চতম জলপ্রপাত।

7.প্রপাত কূপ:
জলপ্রপাতের পাদদেশে সৃষ্ট ঘূর্ণাবর্তের মধ্যস্থিত নুড়ি বা শিলা পাক খেতে খেতে ঘর্ষণের ফলে ভূমি শিলায় যে গর্তের সৃষ্টি করে তাকে প্রপাতকূপ বলে।

8.মন্থকূপ:
প্রবল বেগে প্রবাহিত নদীর তলদেশ বা পার্শ্ব দেশে জলাবতের সৃষ্টি হলে সেখানে নুরি বা শিলার  ঘর্ষণের ফলে যে গর্তের সৃষ্টি হয়, তাকে মন্থকূপ বলে। 

নদীর সঞ্চয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ

ভূমির ঢাল কমে গেলে নদীর মধ্যগতি নিম্নগতি তে নদীবাহিত পলি বালিগাদা নোবিপ্রবি সঞ্চিত হয়ে বিভিন্ন প্রকার সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ গড়ে তোলে

1.পলোল ব্যজনী:
পার্বত্য প্রবাহ থেকে যখন নদী সমভূমিতে পতিত হয় তখন নদীর বহন ক্ষমতা হঠাৎ হ্রাস পাওয়ায় নদীবাহিত পলি, বালি, নুড়ি প্রভৃতি পর্বতের পাদদেশে শঙ্কুর মত জমা হয়। একে বলে পলল শঙ্কু। পাশাপাশি কয়েকটি পলল শঙ্কুর মিলিত হয়ে পলিমঞ্্চ্চচ গঠন করে। যখন সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয় তখন তাকে পলোল শঙ্কুর আকৃতি হয় একে একই পলোল ব্যজনী বা পলল পাখা বলে এর উচ্চতা কল শংকর অপেক্ষা কম হয় যে নদীর জলপ্রবাহ বেশি কিন্তু পরিমাণ কম সেই নদীতে সৃষ্টি হয় উদাহরণ হিমালয় আন্দিজ রকি ইত্যাদি পর্বতের পাদদেশে নদীতে পলোল ব্যজনী সৃষ্টি হয়েছে

2.নদী বাঁক বা মিয়েন্ডার:
মধ্য ও নিম্নপ্রবাহে নদীর গতিবেগ কম থাকায় সামান্য বাধার সম্মুখীন হলে নদীর গতিপথের পরিবর্তন ঘটায় এবং এঁকে বেঁকে প্রবাহিত হয়, একে নদী বাঁক বলে ।
তুরস্কের আঁকাবাঁকা নদী মিয়েন্ডারেস নাম অনুসারে এই ভূমিরূপ এর নাম হয়েছে মিয়েন্ডার। সমভূমি অঞ্চলেে নদীর গতিপথে পলোল অবক্ষেপণ এর ফলে নদীর গতি ধীর হয়ে যায় এবং নদীপথ বেঁকে যায়। নদীর বিকেে যাওয়া অংশে অতিরিক্ত ক্ষয়়় এর ফলে খাড়া পাড়ের সৃষ্টি হয় ।খাড়া পাড়ের বিপরীত দিকে নদী  স্রোতের বেগ কম থাকায়়় সঞ্চয় কার্য ঘটতে থাকে। ফলে সেখাানে ঢালু পাড়ের  সৃষ্টিি হয় । উদাহরণ- গঙ্গা নদীতে এবং নদীয়া জেলার জলঙ্গি নদীতে অসংখ্য নদীবাঁক দেখা যায়। 

3.অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ
 নিম্নপ্রবাহে আঁকাবাঁকা পথে প্রবাহিত নদী বাঁক -এর বাইরের পাড়টি ক্ষয়প্রাপ্ত হয় ও বাঁকের অভ্যন্তরীণ পাড়টিতে পলি সঞ্চিত হয়়। এর ফলে নদীর বাঁক আরোও বাড়তে থাকে এবং একসময় দুটি বাঁক পৃথককারী বাঁকের গ্রীবা অংশটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ঘোড়ার ক্ষষুরের মত একটি অংশ নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ও মূল নদীটি  সোজাপথে প্রবাহিত হয়। এই প্রকার ঘোড়ার খুরের মত বিচ্ছিন্ন অবরুদ্ধ হদকে  অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ বলে। এই ভূমিরূপটি মূলত নদীর ক্ষয়, বহন ও অবক্ষেপণ এর মিলিত কাজের ফলে সৃষ্টি হয়। উদাহরণ-গঙ্গা নদীর নিম্ন প্রবাহ দেখা যায়। 

4.প্লাবনভূমি:
সমভূমি প্রবাহের সময় নদীখাতের গভীরতা হ্রাস পায়।এই সময় নদীর জল হঠাৎ বৃদ্ধি পেলে (অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে) অতিরিক্ত জল নদীরখাত ছাপিয়ে পার্শ্ববর্তী উপত্যাকা অঞ্চলকে প্লাবিত করে এবং নদীবাহিত পলি, বালি, কাদা পার্শ্ববর্তী এলাকায় জমা হয়ে সমভূমির সৃষ্টি হয়, একে প্লাবনভূমি বলে। উদাহরণ- গঙ্গাা, সিন্ধু প্রভৃতি নদীর সমভূমি প্রবাহে প্লাবনভূমি দেখা যায়়। 

5.স্বাভাবিক বাঁধ:
নদীতে প্লাবন হওয়ার সময় নদীখাতের ঠিক পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সর্বাধিক পরিমাণে পলি জমা হয়। এইভাবে একাধিকবার পলি জমা হতে হতে নদী এবং প্লাবনভূমির মধ্যবর্তী অঞ্চলে একটু বেশি উচ্চতাসম্পন্ন ভূমির সৃষ্টি হয়, একে স্বাভাবিক বাঁধ বলে। 
স্বাভাবিক বাঁধ এর নদীর দিকে ঢাল খাড়া এবং প্লাবনভূমির দিকটি ক্রমশ ঢালু হয়। স্বাভাবিক বাঁধ এর গড় উচ্চতা 2 থেকে 3 মিটার হয়। কিন্তু পো, হোয়াংহো নদীতে 7 থেকে 10 মিটার পর্যন্ত স্বাভাবিক বাঁধ এর উচ্চতা দেখা যায়। মিশরে নীলনদের গতিপথে একাধিক স্বাভাবিক দেখা যায়। 

6.খাঁড়ি:
মোহনার কাছে নদীর স্রোত বেশি হলে অথবা জোয়ার ভাটার প্রকোপ অধিক থাকলে নদীবাহিত পলি, কাদা, বালি প্রভৃতি সঞ্চিত হতে পারে না। এর ফলে নদীর মোহনা যথেষ্ট খোলা ও চওড়া হয়। একে খাঁড়ি বা ফাথ বলা হয়। বর্তমানে সুন্দরবন অঞ্চলের অধিকাংশ নদীগুলি খাঁড়ির অন্তর্গত। উদাহরণ- রাশিয়ার উত্তরাংশে অবস্থিত ওব নদীর মোহনায় অবস্থিত খাঁড়িটি হল পৃথিবীর দীর্ঘতম খাঁড়ি। এর দৈর্ঘ্য প্রায় 885 কিমি এবং এটি প্রায় 80 কিমি চওড়া। 

7.বদ্বীপ:
নদীর মোহনা সংলগ্ন অংশে নদীবাহিত পলি, বালি,কাদা প্রভৃতি সঞ্চিত হয়ে মাত্রাহীন 'ব' কিংবা গ্রিক অক্ষর ডেল্টার ন্যায় অবস্থান করলে, তাকে বদ্বীপ বলে।
     যখন একটি নদী কোনো স্থির জলাশয়ে পতিত হয়ে সেখানে নুড়ি, পলি, বালি, কাদায় সঞ্চয় করে, তাকে বদ্বীপ বলে। 
বদ্বীপ বিভিন্ন প্রকারের হয়। যেমন- ত্রিকোণাকার বদ্বীপ, ধনুকাকৃতি ব-দ্বীপ, পাখির পায়ের আকৃতিবিশিষ্ট বদ্বীপ, হদ বদ্বীপ, সমুদ্র বদ্বীপ প্রভৃতি। উদাহরণ - গঙ্গা-ব্রহ্মপুএ -এর বদ্বীপ পৃথিবীর মধ্যে বৃহত্তম। এছাড়াও হুগলি নদীর মোহনায় সাগরদ্বীপ অন্যতম। 

No comments:

Post a Comment

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়: ১.ভূমিক্ষয় রোধ করা: মরু প্রান্তীয় এলাকায় মাটি ক্ষয় রোধ করতে ঢালু এলাকায় সমোন্নতিরেখা চাষ, বায়ুরোধক দেয়া...