Monday, May 4, 2020

উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল

উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল:


অবস্থান:
ভারতের একবারে উত্তরে অবস্থিত পার্বত্য অঞ্চল উত্তর-পশ্চিমে জম্বু কাশ্মীর ( নাঙ্গা পর্বত) থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্বে অরুণাচল প্রদেশ (নামচাবারোয়া) পর্যন্ত ধনুক বা আধখানা চাঁদের মতো অবস্থান করছে। 
পর্বতশ্রেণী:
ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য অনুসারে ভারতের পার্বত্য অঞ্চলটিকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায় যথা- 
  • i.হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল 
  • ii..উত্তর-পূর্ব ভারতের পার্বত্যভূমি বা পূর্বাঞ্চল



i.হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল:
পৃথিবীর উচ্চতম পর্বত শ্রেণী হলো হিমালয় হিমালয় কথার অর্থ বরফের গৃহ। ভূ-প্রাকৃতিক গঠনের ভিত্তিতে হিমালয় পর্বতকে উত্তর থেকে দক্ষিনে প্রস্থ বরাবর চারটি সমান্তরাল পর্বতশ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়। যথা-
  • a.ট্র্যান্স বা টেথিস হিমালয় 
  • b.হিমাদ্রি হিমালয়
  • c.হিমাচল হিমালয় 
  • d. শিবালিক হিমালয়

a.ট্র্যান্স বা টেথিস হিমালয় :
হিমালয় চারটি পর্বত শ্রেনীর মধ্যে সবচেয়ে উত্তরে অবস্থিত হল ট্র্যান্স বা টেথিস হিমালয় । ভারতের জম্মু-কাশ্মীর ও হিমাচল প্রদেশে কিছু অংশ থাকলেও এর অধিকাংশই তিব্বতে অবস্থিত। তাই এর নাম তিব্বতীয় হিমালয় ।
  •  টেথিস নামক মহীখাত এ 12 কোটি বছর আগে প্রথম ভূ আলোড়নে হিমালয়ের এই অংশ সৃষ্টি হয় বলে একে টেথিস হিমালয় বলা হয়। 
  • এখানকার গড় উচ্চতা 3000 থেকে 5000 মিটার । জাস্কার , লাদাখ ও কারাকোরাম এই অংশের প্রধান পর্বত। জাস্কার পর্বতে লিওপারগেল(7420) এই অংশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। 

b.হিমাদ্রি হিমালয়:
টেথিস হিমালয়ের দক্ষিণে অবস্থিত সর্বোচ্চ পর্বত শ্রেণী হিমাদ্রি নামে পরিচিত । টেথিস হিমালয় সৃষ্টির সময়ে হিমাদ্রি হিমালয় সৃষ্টি হয়। 
  • রূপান্তরিত শিলা দিয়ে গঠিত এই পর্বতমালার উচ্চতা 6000 মিটার । 
  • পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (8848 মিটার ) ও তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা হিমাদ্রি হিমালয়ে অবস্থিত। 
  • এছাড়াও অপর উল্লেখযোগ্য পর্বত শৃঙ্গ গুলি হল - মাকালু , ধবলগিরি , অন্নপূর্ণা , নন্দাদেবী ইত্যাদি। 
  • এই পর্বত শৃঙ্গ গুলিতে সারা বছর বরফ জমে থাকে । 

c.হিমাচল হিমালয় :
হিমাদ্রি হিমালয়ের দক্ষিণে যে সুউচ্চ পর্বত শ্রেণী পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত তাকে হিমাচল হিমালয় বা মধ্য হিমালয় বলে । প্রায় 2.5 থেকে 3 কটি বছর আগে দ্বিতীয়বার সংঘটিত প্রবল ভূআলোড়়নে হিমালয়ের এই অংশটি সৃষ্টি হয়। 
  • হিমাচল হিমালয়ের গড় উচ্চতা 3000 থেকে 4500 মিটার। 
  • এই পর্বতমালার গুরুত্বপূর্ণ পর্বতশ্রেণী হলো পিরপাঞ্জালমুসৌরি , ধওলাধর, নাগটিবা ইত্যাদি। 

d. শিবালিক হিমালয়:
হিমালয় সর্ব দক্ষিণের পর্বতশ্রেণী শিবালিক বা বহিঃ হিমালয় নামে পরিচিত । প্রায় 20 লক্ষ থেকে 2 কোটি বছর আগে তৃতীয় বার প্রবল আলোড়নে শিবালিক হিমালয় সৃষ্টি হয়। 
  • শিবালিক হিমালয়ের উচ্চতা 600 থেকে 1500মিটার। 
  • শিবালিক ও হিমাচল হিমালয়ের মাঝে সংকীর্ণ উপত্যকা কে বলা হয় দুন। যেমন- দেরাদুন , কোটা প্রভৃতি। 
  • শিবালিক হিমালয়ের পাদদেশে ঘন অরণ্যাবৃত স্যাঁতসেঁতে অঞ্চল হল তরাই অঞ্চল। 


আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে দৈর্ঘ্য বরাবর হিমালয় পর্বতকে তিন ভাগে বিভক্ত  করা হয়।যথা-
  •  পশ্চিম হিমালয়
  •  মধ্য হিমালয় 
  • পূর্ব হিমালয়

পশ্চিম হিমালয়:
নবগঠিত কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখের দক্ষিণ-পশ্চিমে ও জম্বু কাশ্মীরের উত্তরাংশে অবস্থিত নাঙ্গা পর্বত থেকে পূর্বে নেপালের কালি নদী পর্যন্ত পশ্চিম হিমালয় অবস্থিত। সমগ্র জম্বু কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ড নিয়ে এই অংশটি গঠিত হয়েছে। পশ্চিম হিমালয় তিনটি ভাগে বিভক্ত। যথা-
  •  কাশ্মীর হিমালয় 
  • হিমাচল হিমালয়
  •  কুমায়ুন হিমালয়

কাশ্মীর হিমালয়:
জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের 3,50,000 বর্গ কিমি স্থান জুড়ে কাশ্মীর হিমালয় অবস্থিত । এর দক্ষিণাংশে জম্বু ও পুঞ্জ  পাহাড় এবং উত্তরে রয়েছে পিরপাঞ্জাল পর্বত শ্রেণী । কাশ্মীর হিমালয়ের উল্লেখযোগ্য গিরিপথ গুলি হল - খারদুংলা, বানিহাল ,রোটাং প্রভৃতি । ডাল, উলার ও  নিশার হল উল্লেখযোগ্য হ্রদ। 

হিমাচল হিমালয়:
হিমাচল প্রদেশ এ অবস্থিত শতদ্রু ও যমুনা নদীর মধ্যবর্তী অংশে প্রায় 56,000 বর্গ কিমি স্থান জুড়ে হিমাচল হিমালয় বা পাঞ্জাব হিমালয় বিস্তৃত রয়েছে । এই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পর্বতশ্রেণীগুলি হল পিরপাঞ্জাল, মসৌরি ,নাগটিবা। পিরপাঞ্জাল এর মধ্য দিয়ে রহটাং গিরিপথ উত্তরে লাহুল ও দক্ষিনে কুলু উপত্যকা দুটিকে যুক্ত করেছ। 

কুমায়ুন হিমালয়:
নবগঠিত রাজ্য উত্তরাখণ্ডের প্রায় 46,000 বগ কিমি স্থান জুড়ে কুমায়ুন হিমালয় অবস্থিত । নৈনিতাল সাততাল, ভিমতাল প্রভৃতি হিমবাহ সৃষ্ট হ্রদ এখানে দেখা যায়। উল্লেখযোগ্য পর্বত শৃঙ্গ গুলি হল নন্দাদেবী, কামেট, ত্রিশূল ইত্যাদি। 


মধ্য হিমালয়:
পশ্চিমে কালি নদী থেকে পূর্বে সিঙ্গালিলা পর্বতশ্রেণী পর্যন্ত নেপাল রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে মধ্য হিমালয় বিস্তার লাভ করেছে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট মধ্য হিমালয়ের অন্তর্গত। 

পূর্ব হিমালয়:
পশ্চিমে সিঙ্গালিলা থেকে পূর্ব ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত পর্যন্ত পূর্ব হিমালয় বিস্তৃত । সমগ্র পূর্ব হিমালয় কে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় । যথা -
  1. দার্জিলিং ও  সিকিম হিমালয় 
  2. ভুটান হিমালয় 
  3. অরুণাচল হিমালয়

দার্জিলিং ও সিকিম হিমালয়:
পূর্বে সিঙ্গালিলা ও ডঙ্গকিয়ালা পর্বতশ্রেণীর মধ্যে অবস্থিত এই অংশটি সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলা পার্বত্য  অংশে অবস্থিত । দার্জিলিং এর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ সান্দাকাফু (3630 মিটার) এবং সিকিমের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা  (8598 মিটার) পৃথিবীর দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ । ঘুম শৈলশিরা এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে। 

ভুটান হিমালয়
  ভুটান হিমালয় ভুটান রাষ্ট্রে অবস্থিত। চমলহারি( 7314) মিটার এই অংশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ । 

অরুণাচল হিমালয় 
এটি আসাম ও অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যে প্রায় 67500 বর্গকিমি স্থান জুড়ে অবস্থিত। এখানে শিবালিক , হিমাচল ও হিমাদ্রি পর্বতশ্রেণী দেখতে পাওয়া যায় । নামচাবারোয়া ( 7776 মিটার )এই অংশে সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।


ii.উত্তর-পূর্ব ভারতের পার্বত্যভূমি বা পূর্বাঞ্চল:
উত্তর-পূর্বের পার্বত্য ভূমি অঞ্চলটি মূলত পূর্ব হিমালয়ের অংশ। এই অঞ্চলটি উত্তরে চিন, পূর্বে মায়ানমার , দক্ষিণ-পশ্চিমে বাংলাদেশ এবং উত্তর-পশ্চিমে ভুটান অবস্থিত। 
উত্তর-পূর্ব পার্বত্য ভূমি কে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
  •  a.পূর্বাঞ্চল 
  •  b.মেঘালয় মালভূমি 

a.পূর্বাঞ্চল:
উত্তর-পূর্ব ভারতের পার্বত্য অংশে ভারত ও মায়ানমার সীমান্তে (মেঘালয় বাদে) বরাবর উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত সমান্তরাল শৈল শ্রেণি একত্রে পূর্বাঞ্চল নামে পরিচিত। 
  • এই পর্বত শ্রেনীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মিশমি পাহাড়, পাটকই , এছাড়া নাগা পাহাড় , শৃঙ্গ সরামতী , উত্তর কাছাড় পাহাড় , মনিপুর পাহাড় , মিজো পাহাড় ও ত্রিপুরা পাহাড় প্রভৃতি। 

b.মেঘালয় মালভূমি:
মেঘালয় প্রদেশে গারো , খাসি, জয়ন্তিয়া ও মিকিরের পাহাড়ি অঞ্চল নিয়ে গঠিত মেঘালয় মালভূমি প্রকৃতপক্ষে দাক্ষিণাত্য মালভূমির বিভিন্ন অংশ। 
  • এই মালভূমির পশ্চিমে অবস্থিত গারো পাহাড়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ নকরেক
  • এর উত্তরে শিলং পাহাড় , উত্তর-পূর্বের পাহাড় মিকির পাহাড়ি অঞ্চল, মধ্যভাগে খাসি ও জয়ন্তিিয়া পাহাড় অবস্থিত। 

No comments:

Post a Comment

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়: ১.ভূমিক্ষয় রোধ করা: মরু প্রান্তীয় এলাকায় মাটি ক্ষয় রোধ করতে ঢালু এলাকায় সমোন্নতিরেখা চাষ, বায়ুরোধক দেয়া...