Sunday, November 29, 2020

হিমবাহের ক্ষয় ও সঞ্চয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ

হিমবাহ পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাবে পার্বত্য অঞ্চলের তুষারক্ষেত্রে জমে থাকা বরফ অত্যন্ত ধীর গতিতে পর্বতের ঢাল বা সুনির্দিষ্ট খাত বা উপত্যাকা বরাবর নিচের দিকে নেমে আসে। এই তুষার প্রবাহকে বলে হিমবাহ। এটি একটি বিশাল বরফের স্তুপ যা বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে অবস্থান করে।

অবস্থান অনুসারে হিমবাহ কে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- ১.মহাদেশীয় হিমবাহ ২.পর্বত পাদদেশীয় হিমবাহ ৩.পার্বত্য বা উপত্যকা হিমবাহ।

হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ:

1.সার্ক বা করি:
উচ্চ পার্বত্য এলাকায় হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে যে অবতল আকৃতির উপত্যকা সৃষ্টি হয় তা দেখতে অনেকটা আরামকেদারার মত হয়। একে ফরাসি ভাষায় সার্ক এবং ইংরেজিতে করি বলে। বরফ মুক্ত হলে এই ভূমিরূপ দৃশ্যমান হয়। এর তিনটি অংশ থাকে- a.মস্তকের দিকে খাড়া প্রাচীর,  b.মধ্যভাগে খাত বা বেসিন, c.প্রান্ত দেশের চৌকাট বা করি ওষ্ঠ। করির মধ্যভাগের অবনত বেসিন অঞ্চলে জল জমে করি হ্রদের সৃষ্টি করে।

2.অ্যারেট:
পাশাপাশি প্রবাহিত দুটো হিমবাহের মধ্যে সংকীর্ণ ছুরির ফলার মতো তীক্ষ্ণ উচ্চভূমি বা বিভাজিকাকে অ্যারেট বা হিমশিরা বলে। এগুলি কখনও কখনও করাতের দাঁতের মতো খাঁজকাটা হয়ে থাকে।

3.পিরামিড চূড়া:
একটি পর্বতের বিভিন্ন দিকে কয়েকটি হিমবাহ বা সার্ক সৃষ্টি হলে, পর্বত শীর্ষটি পিরামিডের মতো খাড়া ও তীক্ষ্ণ অংশে পরিণত হয়, একে পিরামিড চূড়া বলে। হিমালয় পর্বতের নীলকণ্ঠ শৃঙ্গ্, নেপালের মাকালু এরূপ একটি পিরামিড চূড়া।

4.কর্তিত শৈলশিরা:
হিমবাহ পর্বতের উপত্যাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সময় উপত্যাকার  উভয় পার্শ্বস্থ স্পার বা পর্বতের অভিক্ষিপ্তাংশ সমূহের সম্মুখভাগগুলিকে কেটে দ্রোনী বা উপত্যাকাকে আরও চওড়া ও সোজা করে দেয়। এরূপ কর্তিত স্পার গুলিকে কর্তিত শৈলশিরা বলে। এটি দেখতে ত্রিভুজাকার। এরূপ উপত্যকার মধ্য দিয়ে হিমবাহ প্রবাহিত হওয়ার ফলে উপত্যাকার মধ্যভাগ খুব প্রশস্ত ও গভীর হয় এবং এর পার্শ্বদেশ খুব খাড়া হয়ে U আকৃতির উপত্যকায় পরিণত হয়।

5.'U' আকৃতির উপত্যকা বা হিমদ্রোণী:
হিমবাহের ক্ষয় কার্যের মাধ্যমে অত্যন্ত প্রশস্থ মোটামুটি মসৃণ ও খাড়া ঢ়ালের পার্শ্বদেশবিশিষ্ট যে হিমবাহ উপত্যকা সৃষ্টি হয় তাকে হিমদ্রোণী বলে। হিমদ্রোণী দেখতে ইংরেজি U অক্ষরের মত তাই একে U আকৃতির উপত্যকাও বলে। উদাহরণ- হিমালয়ের রূপকুণ্ড একটি হিমদ্রোণী ।

6.ঝুলন্ত উপত্যকা:
কোন মূল হিমবাহের একধিক উপহিমবাহ এসে পড়ে। মূল হিমবাহের উপত্যকার গভীরতা উপহিমবাহ অপেক্ষা অনেক বেশি হয়। হিমবাহ অপসারিত হলে উপহিমবাহের উপত্যকাগুলি মূল হিমবাহের উপর ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে বলে মনে হয়, একে ঝুলন্ত উপত্যকা বলে। বদ্রীনাথ এর কাছে ঋষি গঙ্গা একটি ঝুলন্ত উপত্যকা।

7.রসে মতানে:
হিমবাহের প্রবাহপথে অবস্থিত কঠিন শিলাগঠিত ঢিপির প্রতিবাত ঢাল ঘর্ষনের মাধ্যমে মসৃণ হয় এবং অনুবাত ঢাল উৎপাটনের মাধ্যমে এবড়োখেবড়ো, খাঁজকাটা ও অমসৃণ হয়। এই প্রকার ভূমিরূপকে রসেমতানে বলে। উদাহরণ- কাশ্মীর উপত্যকার ঝিলাম নদীর উপনদী লিডারের উপত্যাকাতে রসে মতানে দেখা যায়।

8.ক্র্যাগ ও টেল:
হিমবাহের প্রবাহপথে প্রথমে কঠিন শিলা ও পরে কোমল শিলা অবস্থান করলে কোমল শিলা সরাসরি ক্ষয় এর হাত থেকে রক্ষা পেয়ে কঠিন শিলার পেছনে লেজের মতো অবস্থান করে। এইরূপ ভূমিরূপকে ক্র্যাগ ও টেল বলে।

9.ফিয়র্ড:
ফিয়র্ড হল হিমবাহ কর্তিত উপত্যাকা যা সমুদ্রের জল দ্বারা প্লাবিত হয়ে সমুদ্রতলে অবস্থান করে। এর প্রান্তভাগে চৌকাঠের ন্যায় একটি অংশ উপস্থিত থাকে। এর উর্ধাংশে বরফের গভীরতা বেশি থাকায় ক্ষয় পরিমাণ বেশি। উদাহরণ-নরওয়ের সোজনে ফিয়র্ড পৃথিবীর গভীরতম ফিয়র্ড।



হিমবাহের সঞ্চয় কার্যের ফলে গঠিত ভূমিরূপ:

1.গ্রাবরেখা:
উচ্চ পার্বত্য হিমবাহের সঞ্চয়কার্যের ফলে সৃষ্ট প্রধান ভূমিরূপ হল গ্রাবরেখা। উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল থেকে ক্ষয়জাত নুড়ি, পাথর, শিলাখণ্ড প্রভৃতি হিমবাহ দ্বারা বাহিত হয়ে বিভিন্নভাবে জমা হয়ে যে ভূমিরূপ সৃষ্টি করে, তাকে গ্রাবরেখা বলে। অবস্থান ও প্রকৃতি অনুসারে গ্রাবরেখাকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- 
a.প্রান্ত গ্রাবরেখা 
b.ভূমি গ্রাবরেখা
c.পার্শ্ব গ্রাবরেখা 
d.মধ্য গ্রাবরেখা
e.হিমাবদ্ধ গ্রাবরেখা 
f.হিমতল গ্রাবরেখা প্রভৃতি।

পার্শ্ব গ্রাবরেখা:
হিমবাহের পার্শ্ববর্তী পাহাড়ের ঢাল থেকে আবহবিকারজাত পদার্থ, তুষারপাতজাত পদার্থ প্রভৃতি হিমবাহের দু'পাশে সঞ্চিত হয়ে পার্শ্ব গ্রাবরেখা সৃষ্টি হয়।
মধ্য গ্রাবরেখা:
দুটি পার্শ্ব গ্রাবরেখা পরস্পর সংযুক্ত হয়ে মধ্য গ্রাবরেখা গঠন করে।
প্রান্ত গ্রাবরেখা:
হিমবাহের সম্মুখভাগে সঞ্চিত গ্রাবরেখাকে প্রান্ত গ্রাবরেখা বলে। তিস্তা নদীর উচ্চ অববাহিকা লাচুং ও লাচেন নামক স্থানে বিভিন্ন প্রকার গ্রাবরেখা লক্ষ্য করা যায়।

বহিঃধৌত সমভূমি:
হিমবাহ পার্বত্যপ্রবাহ থেকে পর্বত পাদদেশে নেমে এসে গলে গেলে ওই হিমবাহবাহিত নুরি,পাথর, কাদা প্রভৃতি একত্রে সঞ্চিত হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সমভূমি সৃষ্টি করে, একে বহিঃধৌত সমভূমি বলে। উদাহরণ: আইসল্যান্ডের দ্বীপে বহিঃধৌত সমভূমি দেখা যায়। যার স্থানীয় নাম Sundur।

ড্রামলিন:
হিমবাহ বাহিত নুড়ি, পাথর প্রভৃতি পর্বত পাদদেশে সঞ্চিত হয়ে উল্টানো চামচ বা উল্টানো নৌকার মতো এক প্রকার ঢেউ খেলানো ভূমিরূপ সৃষ্টি করে, এদের ড্রামলিন বলে। অনেকগুলি ড্রামলিন একসঙ্গে অবস্থান করলে অঞ্চলটি ডিম ভর্তি ঝুড়ির মত হয় বলা হয়। তাই এই ভূমিরূপকে  Busket of Eggs Relief।  একটি আদর্শ ড্রামলিনের দৈর্ঘ্য 1 থেকে 2 কিমি, প্রস্থ 400 থেকে 600 মিটার এবং উচ্চতা 15 থেকে 30 মিটার হয়। উদাহরণ- আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরে, ইংল্যান্ডের উত্তরে, আয়ারল্যান্ডের উত্তরে প্রভৃতি স্থানে ড্রামলিন দেখতে পাওয়া যায়।

কেম:
নিশ্চল বা গতিহীন হিমবাহের পার্শ্বদেশ বরাবর দুটি নদী প্রবাহিত হয় । এই নদী দ্বারা হিমবাহ উপত্যকার পার্শ্বদেশে সঞ্চিত পিন্ডাকৃতি ঢিবিকে কেম বলে। কেম গুলি পরস্পর যুক্ত হয়ে হিমবাহের দুপাশে মঞ্চের আকারে অবস্থান করলে তাদের কেমমঞ্চ বলে। উদাহরণ-স্কটল্যান্ড এর ল্যামারমুয়ার হিমবাহ উপত্যকায় কেম ও কেমমঞ্চের সৃষ্টি হয়েছে।

এসকার:
অনেক সময় পাদদেশীয় হিমবাহের তলদেশের অংশ গলে গিয়ে হিমবাহের তলদেশে সুরঙ্গ সৃষ্টি করে এবং তার মধ্যে তার মধ্য দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়। এই জলধারা সুড়ঙ্গের মধ্যে নুড়ি, বালি, কাদা, শিলাখণ্ড প্রভৃতি জমা করে অনুচ্চ, আঁকাবাঁকা, দীর্ঘ শৈলশিরার মতো ভূমি তৈরি করে, একে এসকার বলে। এর উচ্চতা গড়ে 3 থেকে 5 মিটার এবং দৈর্ঘ্য কয়েক কিমি পর্যন্ত হয়। উদাহরণ- এটি আয়ারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড স্থানে দেখা যায়।

কেটল্:
অনেক সময় যখন হিমবাহের পশ্চাদপসরণ ঘটতে থাকে তখন কোথাও কোথাও গভীর গর্ত ইত্যাদির মধ্যে নিশ্চল হিমরাশি রয়ে যায় এবং অনুবাহ বা ঢিলের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে যায় বা চাপা পড়ে যায়। পরবর্তীকালে সেই নিশ্চল হিমরাশি গলে গলে সেখানে গর্ত থেকে যায় ও হ্রদের সৃষ্টি হয়। এরূপ হ্রদকে কেটল্ হ্রদ বলে এবং গর্ত কি বলে কেটল্। উদাহরণ: উত্তর ইউরোপের অনেক স্থানে নব ও কেটলের অবস্থান লক্ষ্য করা যায় এবং ওই সব অঞ্চলের ভূমিরূপকে নব ও কেটল্ সমন্বিত ভূমিরূপ বলা হয়‌

No comments:

Post a Comment

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়: ১.ভূমিক্ষয় রোধ করা: মরু প্রান্তীয় এলাকায় মাটি ক্ষয় রোধ করতে ঢালু এলাকায় সমোন্নতিরেখা চাষ, বায়ুরোধক দেয়া...