Thursday, December 24, 2020

বায়ুর ক্ষয় ও সঞ্চয় কার্যের ফলে গঠিত ভূমিরূপ

বায়ুর ক্ষয় কার্যের ফলে গঠিত ভূমিরূপ:

1.অপসারণ গর্ত বা ধান্দ:
বায়ু কোন স্থান থেকে প্রচুর  অসংবদ্ধ বালুকণা অন্যত্র স্থানান্তর করলে এক নীচু গর্তের সৃষ্টি হয়,যা ধান্দ বা অপসারণ গর্ত নামে পরিচিত। এরা সাধারণত দুটি বালিয়াড়ি মাঝে তৈরি হয়। এর ক্ষেত্রফল প্রায় 19,500 বর্গকিমি। উদাহরণ- আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা থেকে টেক্সাস পর্যন্ত অঞ্চলে কয়েকশো ফুট গভীর ও কয়েক মাইল ব্যাসার্ধ যুক্ত প্রচুর অপসারণ গর্ত দেখা যায়।

2.গৌর:
মরু অঞ্চলে বায়ুপ্রবাহকালে ভূপৃষ্ঠ থেকে 2 মিটারের মধ্যে অধিক পরিমাণে বালিকণা থাকায় এই অঞ্চলে অধিক ক্ষয় হয়। নিম্নাংশে অধিক পরিমাণে ক্ষয়ের ফলে মরু অঞ্চলে মাঝে মাঝে ব্যাঙের ছাতার মতো ওপরের অংশ প্রশস্ত ও সরু নিম্নাংশ বিশিষ্ট যে পাথরের অবশিষ্ট অংশ দেখা যায়, তাকে গৌর বলে। উদাহরণ: সাহারা মরুভূমিতে এই প্রকার ভূমিরূপ দেখা যায়। এগুলি ব্যাঙের ছাতার মতো দেখতে হয় বলে এদের মাশরুম রক বলে। একধিক গৌরকে গারা বলে

3.জুগ্যান:
মরু অঞ্চলে কঠিন ও কোমল শিলা অনুভূমিকভাবে অবস্থান করলে কঠিন শিলার দারুন ও ফাটল বরাবর বায়ু ক্ষয় করতে করতে নরম পৌঁছালে নরম শিলা দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। এর ফলে কঠিন শিলায় চ্যাপ্টা মাথা বিশিষ্ট যে ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, তাকে জুগ্যান বলে। উদাহরণ- কালাহারি এবং অস্ট্রেলিয়ায় মরুভূমিতে এইরূপ ভূমিরূপ দেখা যায়। এদের মাথা গুলি চ্যাপ্টা হয় এবং ছোট ছোট ব্যাঙের ছাতার মতো দেখতে হয়।

4.ইয়ারদাং:
মরু অঞ্চলে কঠিন ও কোমল শিলা পাশাপাশি উলম্বভাবে অবস্থান করলে বৈষম্যমূলক ক্ষয়ের ফলে কঠিন শিলায় প্রাচীর ও কোমল শিলায় খাত সৃষ্টি হয়, একে ইয়ারদাং বলে। কোমল শিলা তুলনায় কঠিন শিলা 5-15 মিটার পর্যন্ত উঁচুতে অবস্থান করে। উদাহরণ:চিলির আটাকামা এবং তুর্কিস্তানের মরু অঞ্চলে এই ধরনের ভূমিরূপ দেখা যায়। ইয়ারদাং এর মাথাা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে তীক্ষ্ণ ও ছুঁচালো আকৃতির হলে তাকে নিডিল বলে।

5.ইনসেলবার্জ:
শুষ্ক মরু অঞ্চলে ক্ষয়কার্যের ফলে অনেক সময় কঠিন শিলা গঠিত মসৃণ গাত্র ও অবতল ঢাল বিশিষ্ট অনুচ্চভূমি অবস্থান করে, এদের ইনসেলবার্জ বলে। উদাহরণ: কালাহারি মরুভূমিতে এইরূপ ভূমিরূপ দেখা যায়। ইনসেলবার্জ অধিক ক্ষরিত হলে গোলাকার মস্তকবিশিষ্ট টিবিতে পরিণত হয়। তাকে বোনহার্ড এবং গভীর আবহবিকারের ফলে পাথরের খন্ডের স্তুপে পরিণত হলে তাকে ক্যাসলকপিজ বলে।


বায়ুর সঞ্চয় কার্যের ফলে গঠিত ভূমিরূপ:

1.বালিয়াড়ি:
বায়ুর সঞ্চয়কার্যের ফলে গঠিত প্রধান ভূমিরূপ হল বালিয়াড়ি।বায়ু তার প্রবাহ পথে কোন প্রকার প্রতিবন্ধক বা উঁচু নীচু ভূপ্রকৃতির দ্ব্বারা বাধাপ্রাপ্ত হলে ওই প্রতিবন্ধকের গায়ে বালি জমে যে স্তুপের সৃষ্টি করে তাকে বালিয়াড়ি বলে। বালি জমা হওয়ায় প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে একে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। যথাা-
i.বার্খান:
বায়ুর গতিপথে সঙ্গে আড়াআড়িভাবে অবস্থিত অর্ধচন্দ্রাকৃতি বালিয়াড়িকে বার্খান বলে। এর অনুবাত ঢাল খাড়া ও প্রতিবাত ঢাল মৃদু প্রকৃতির হয়। পৃথিবীর সব মরুভূমিতে বার্খান দেখা যায়। বার্খানের দুপাশে অর্ধচন্দ্রাকারে দুটি শিং এর মত মতো শিরা দেখা যায়। এর গড় উচ্চতা প্রায় 10 মিটার হলে প্রস্থে প্রায় 50-60 মিটার হয়।
ii.সিফ্ বালিয়াড়ি:
আরবি শব্দ সিফ্ কথার অর্থ সোজা তরবারি। বায়ুর গতিপথের সমান্তরালে গঠিত দীর্ঘ বালির শৈলশিরাাকে সিফ্ বালিয়াড়ি বলে। সাধারণত বার্খান থেকে সিফ্ বালিয়াড়ি সৃষ্টি হয়।সিফ্ বালিয়াড়ি দৈর্ঘ্যে কয়েকটি কিমি থেকে কয়েক শ' কিমি হতে পারে ও উচ্চতা কয়েকশো মিটার হয়। দুটিিি বালিয়াড়ির মাঝে বালিবিহীন হামাদা বা রেগ দেখা যায়। এই ধরনের বালিয়ারির শীর্ষষ তীক্ষ্ণ করাতের মত হয়। উদাহরণ সাহারা, অস্ট্রেলিয়া ও কালাহারি ও থর মরুভূমি।

2.লোয়েস সমভূমি:
বায়ুবাহিত অতিসূক্ষ্ম বালিকণা, মৃত্তিকাকনা প্রভৃতি উৎস অঞ্চল থেকে বহুদূরের কোন স্থানে অধঃক্ষিপ্ত হলে তাকে লোয়েস বলে। এই লোয়েস কনা জমা হওয়ার ফলে কোনো নিচু স্থানে যদি সমভূমির সৃষ্টি হয়, তবে তাকে লোয়েস সমভূমি বলে।
উদাহরণ: মধ্য এশিয়ার গোবি মরুভূমি বালুরাশি বাহিত হয়ে চীনের হোয়াংহো নদীর অববাহিকায় সঞ্চিত হয়ে লোয়েস সমভূমির সৃষ্টি হয়েছে।


বায়ু ও জলধারার মিলিত কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ:

1.ওয়াদি:
মরু অঞ্চলে বালুকারাশির মধ্যে হঠাৎ বন্যার জল তার প্রবাহপথে বেশিক্ষণ দাড়িয়ে থাকতে পারে না কিন্তু তার প্রবাহপথের চিহ্নস্বরূপ শুষ্ক খাতটি পড়ে থাকে। এরুপ শুষ্ক খাতটিকে ওয়াদি বলে।

2.পেডিমেন্ট:
'Pedi' শব্দটির অর্থ পাদদেশ এবং 'Mont' শব্দটির অর্থ পার্বত। সুতরাং পেডিমেন্ট বলতে পর্বতের পাদদেশের সমতল ভূমিকে বোঝায়। মরুভূমির মধ্যস্থিত পর্বতের পাদদেশে বায়ুপ্রবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে একপ্রকার প্রায় সমতলভূমির সৃষ্টি হয়। এরূপ প্রায় সমতল ভূমির ওপরের অংশ বেশ ঢালু হলেও তার নীচের অংশ মোটামুটি সমতল বলে এখানে ছোট ছোট জলধারা বাহিত শিলা চূর্ণ, নুড়ি, কাকর, বালি, কাদা ইত্যাদি সঞ্চিত হয়ে গঠন করে। এভাবে বায়ুর ক্ষয়কার্য এবং জলধারার সঞ্চয়কার্য যুগ্মভাবে মরুভূমির মধ্যস্থিত পার্বত্য অঞ্চলের পাদদেশে যে সমতলভূমি গঠন করে তাকে পেডিমেন্ট বলে। উদাহরণ: আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির উত্তর পশ্চিম প্রান্তে পেডিমেন্ট লক্ষ্য করা যায়।

3.বাজাদা:
বাজারে একটি স্পেনীয় শব্দ। যার অর্থ- পর্বতের পাদদেশীয় পলল সমভূমি।  এটি পর্বত সীমান্ত থেকে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। অবনত ভূমির চারদিকে পর্বতের পাদদেশে সৃষ্ট পলল শঙ্কু বা পলল পাখাগুলি ক্রমশ বিস্তার লাভ করতে করতে পরস্পর সংযুক্ত হয়ে উচ্চভূমি ও প্লায়া হ্রদের  মাঝে যে মৃদু ঢাল বিশিষ্ট ভূমি গঠন করে তাকে বাজাদা বলে। বাজাদার তলদেশে থাকে পেডিমেন্টেের আবৃত অংশ।

4.প্লায়া:
যখন মরু অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এরূপ একধিক জলধারা কোনো পর্বতবেষ্টিত অবনত ভূমিতে এসে সঞ্চিত হয়, তখন সেখানে হ্রদের সৃষ্টি হয়। মরু অঞ্চলের এই রূপ লবণাক্ত হ্রদকে সাধারণভাবে প্লায়া বলে। প্লায়া উত্তর আফ্রিকায় শট ,ভারতে রাজস্থানে ধান্দ,  যুক্তরাষ্ট্রে স্যালাইনা, যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাংশের ও মেক্সিকোতে এইরূপ পর্বতবেষ্টিত অববাহিকা বোলসন নামে পরিচিত। আরাবল্লী পর্বত অবস্থিত সম্ভর হ্রদ একটি প্লায়া।

No comments:

Post a Comment

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়: ১.ভূমিক্ষয় রোধ করা: মরু প্রান্তীয় এলাকায় মাটি ক্ষয় রোধ করতে ঢালু এলাকায় সমোন্নতিরেখা চাষ, বায়ুরোধক দেয়া...