আমরা যেখানে বাস করি সেই পৃথিবীপৃষ্ঠের ওপরে বেষ্টন করে থাকা আবরণী হল বায়ুমণ্ডল, যা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে পৃথিবীর গায়ে চাদরের মতো জড়িয়ে থাকে। পৃথিবীতে জীবের বেঁচে থাকার জন্য যেমন বায়ুমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ তেমনি বায়ুমণ্ডলসহ পৃথিবীর জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষার্থে অন্যান্য উপাদান গুলির সঠিক মাত্রা থাকাও বাঞ্ছনীয়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি কর্তা নিয়ম অনুসারে গ্যাসীয় উপাদানগুলি তাদের ধর্ম অনুযায়ী এক একটি স্তরে সজ্জিত আছে। আর আবহমানকাল ধরে মহাকাশে বিজ্ঞানীরা সেই সৃষ্টিকর্তার রহস্যে মোড়া বায়ুমণ্ডলের স্তর নিয়ে চিরন্তন গবেষণা করে চলছেন।
পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 10,000 কিমি পর্যন্ত উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত যে অদৃশ্য গ্যাসীয় আবরণ পৃথিবীতে বেষ্টন করে আছে, তাকে বায়ুমণ্ডল বলা হয়। অর্থাৎ পৃথিবী কে বেষ্টনকারী অদৃশ্য গ্যাসীয় আবরণ হল বায়ুমণ্ডল।
বায়ুমণ্ডল গঠনকারী প্রধান উপাদান গুলি হল-
1.গ্যাসীয় উপাদান
2.জলীয়বাষ্প এবং
3.ধূলিকণা
বায়ুমন্ডলে এই সকল উপাদান এর শতকরা 97 ভাগ পদার্থই সমুদ্রপৃষ্ঠতল থেকে 27 থেকে 30 কিমি মধ্যে অবস্থান করে।
1.গ্যাসীয় উপাদান:
বায়ুমন্ডলে বিভিন্ন গ্যাসের উপাদান এর মধ্যে প্রধান হল নাইট্রোজেন(2), অক্সিজেন(2) অর্থাৎ, বায়ুমন্ডলের গ্যাসীয় উপাদান এর প্রায় 99 শতাংশ নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন নিয়ে গঠিত। অন্যান্য গ্যাসগুলির মধ্যে আছে আর্গন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, হিলিয়াম, হাইড্রোজেন, ওজোন, নিয়ন, ক্রিপটন, জেননমিথে, মিথেন প্রভৃতি।
2.জলীয় বাষ্প:
জলের গ্যাসীয় অবস্থাকেই জলীয়বাষ্প বলে।বায়ুমন্ডলের সব স্থানে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ একই থাকে না। উচ্চতা, অক্ষাংশ, উষ্ণতা, স্থলভাগ, ও জলভাগের বন্টন এর তারতম্যের জলীয় বাষ্পের উপস্থিতির তারতম্য ঘটে। মেঘাচ্ছন্নতা, বৃষ্টিপাত, শিশির, তুষারপাত, ঝড় প্রভৃতি দুর্যোগ জলীয়বাষ্পের উপস্থিতির জন্যই সৃষ্টি হয়।
3.ধূলিকণা:
বায়ুমণ্ডলের আরে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ধূলিকণা যা অ্যারোসল নামে পরিচিত। সমুদ্রতীর অথবা মরু অঞ্চলের সূক্ষ্ম বালিকণা, কলকারখানাযর পোড়া কয়লার ছাই, বিভিন্ন প্রকার অতি সূক্ষ্ম খনিজ লবণ, আগ্নেয়গিরি থেকে উৎক্ষিপ্ত ছাইভস্ম, উল্কার ধ্বংসাবশেষ প্রভৃতি ধূলিকণা রূপে বায়ুমন্ডলে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে।
উপাদান ও উষ্ণতার ভিত্তিতে বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস:
উপাদানগত তারতম্যের ভিত্তিতে বায়ুমন্ডলকে দুটি'ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-
1.সমমন্ডল ও 2.বিষমমন্ডল
1.সমমন্ডল(Homosphere) :
সমুদ্র সমতল থেকে ঊর্ধ্বে 100 কিমি( মতান্তরে 80-90 কিমি) উচ্চতা পর্যন্ত অংশে বায়ুমণ্ডল গঠনকারী উপাদানগুলির অনুপাত মোটামুটি একই রকম থাকে, তাই এই স্তর সমমন্ডল(Homosphere) নামে পরিচিত। বিশেষত বিভিন্ন প্রকার গ্যাস, জলীয়বাষ্প এবং জৈব ও অজৈব কণিকা দ্বারা এই স্তরটি গঠিত। এই অঞ্চলের প্রকৃতিই পৃথিবীর জলবায়ু নির্ধারণ করে।
2.বিষমমন্ডল(Heterosphere):
হোমোস্ফিয়ার বা সম মন্ডলের ঊর্ধ্বে প্রায় 100 কিলোমিটার থেকে 10000 কিলোমিটার পর্যন্ত অংশে বায়ুমণ্ডল গঠনকারী উপাদানগুলির অনুপাত একই রকম থাকে না এবং বিভিন্ন গ্যাসের স্তরগুলির মধ্যে বিভিন্নতা দেখা যায়। তাই এই স্তর বিষমমন্ডল(Heterosphere) নামেে পরিচিত। বিশেষত এই স্তরটিতে আণবিক ওজন অনুসারে প্রথমে ভারী গ্যাস এবং ধীরে ধীরে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হালকা গ্যাস অবস্থান করে। এই অঞ্চল চারটি স্তরে বিভক্ত। যথা-
1.আণবিক নাইট্রোজেন স্তর (100-200 কিমি)
2.পরমানবিক অক্সিজেন স্তর(201-1000 কিমি)
3. হিলিয়াম স্তর (1001-2000 কিমি)
4. হাইড্রোজেন স্তর (3500-10000 কিমি)
উষ্ণতার ভিত্তিতে বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস:
উষ্ণতার তারতম্যের ভিত্তিতে বায়ুমন্ডলকে 6 টি ভাগে ভাগ করা যায়।
1.ট্রপোস্ফিয়ার
2.স্ট্রাটোস্ফিয়ার
3.মেসোস্ফিয়ার
4.আয়নোস্ফিয়ার
5.এক্সোস্ফিয়ার
6.ম্যাগনেটোস্ফিয়ার
1.ট্রপোস্ফিয়ার:
এটি বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে নীচের ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন স্তর যেখানে বায়ুমণ্ডলের যাবতীয় পরিবর্তন দেখা যায়।
বিস্তার:
এই স্তর নিরক্ষীয় অঞ্চলে 18 কিমি, ক্রান্তীয় অঞ্চলে 12.5 কিমি এবং মেরু অঞ্চলে প্রায় 8 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত।
বৈশিষ্ট্য:
1.এই স্তরে প্রতি 1000 মিটার উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে 6.4°C হারে উষ্ণতা হ্রাস পায়, একে স্বাভাবিক উষ্ণতা হ্রাস হার ( Normal Lapse Rate) বলে।
2.বায়ুমণ্ডলের 75 শতাংশ গ্যাসীয় উপাদান(N2, O2, CO2) এই স্তরে অবস্থিত।
3.বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ (বজ্র, বিদ্যুৎ, ঝড়, বৃষ্টি) এই স্তরে দেখা যায় , তাই একে ক্ষুব্ধমন্ডল বলা হয় । ট্রপোস্ফিয়ার উর্ধ্বসীমাকে ট্রপোপজ বলা হয় ।(ট্রপোস্ফিয়ার ও স্ট্রাটোস্ফিয়ার এর মধ্যবর্তী সংযোগকারী স্তর হল ট্রপোপজ)
2.স্ট্রাটোস্ফিয়ার:
ট্রপোস্ফিয়ারের উর্ধ্বসীমা ট্রপোপজের ওপরে বায়ুমণ্ডলের স্তর স্ট্রাটোস্ফিয়ার নামে পরিচিত।
বিস্তার:
ট্রপোপজ এর ওপর থেকে অর্থাৎ প্রায় 20 কিমি থেকে 50 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত।
বৈশিষ্ট্য:
1. এই স্তরে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং এর সর্বোচ্চ উচ্চতায় (50 কিমি) তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে 0°C পৌছায়।
2. স্তরটিতে জলীয় বাষ্প ও মেঘ না থাকায় কোনো প্রকার বায়বীয় গোলযোগ ঘটে না অর্থাৎ আবহাওয়া শান্ত থাকে তাই একে শান্তমন্ডল বলা হয়।
3.এই স্তরে 20 থেকে 35 কিমি উচ্চতায় ওজোন(3) গ্যাসের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়, তাই এই অংশকে ওজনোস্ফিয়ার বলে। এই গ্যাস ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে উত্তপ্ত হয় বলেই এই অংশের উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়।
4.এই স্তরের উর্ধ্বসীমাকে অর্থাৎ স্ট্রাটোস্ফিয়ার ও মেসোস্ফিয়ার এর মধ্যবর্তী সংযোগকারী সীমানাকে স্ট্যাটোপজ বলে।
3.মেসোস্ফিয়ার:
স্ট্যাটোপজের ওপরে স্তরটিকে মেসোস্ফিয়ার বলা হয় । বিস্তার:
স্ট্যাটোপজের ওপর থেকে প্রায় 80 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত। বৈশিষ্ট্য:
1.উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই স্তরে উষ্ণতা অতি দ্রুত হারে কমতে থাকে।
2.মেসোস্ফিয়ার এর বায়ুচাপ খুবই কম ।
3.উল্কাপিণ্ড সমূহ এই স্তরে এসে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। 4.এই স্তরের উর্ধ্বসীমাকে অর্থাৎ মেসোস্ফিয়ার ও আয়নোস্ফিয়ার এর মধ্যবর্তী সংযোগকারী সীমানাকে মেসোপজ বলে।
4.আয়োনোস্ফিয়ার:
মেসোপজের ঊর্ধ্বে বায়ুমণ্ডলের চতুর্থ স্তরটিকে আয়নোস্ফিয়ার বলে।
বিস্তার:
মেসোপোজের উর্ধে অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠের 80 কিমি উচ্চতা থেকে 500 কিমি উচ্চতার মধ্যবর্তী অংশে এই স্তরটি অবস্থিত ।
বৈশিষ্ট্য:
1.এই স্তরে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণতা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং অতিবেগুনী ও X-রশ্মি শোষিত হওয়ার কারণে সর্বোচ্চ অংশের উষ্ণতা প্রায় 1200° C পৌঁছায়।2. এই স্তরে বস্তুকণা আয়নিত অবস্থায় থাকে বলে বেতার তরঙ্গ এখান থেকে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসে।
3. এই স্তরের নিম্নাংশের বায়োবীয় উপাদানগুলি সূর্য রশ্মির তেজস্ক্রিয় ক্ষুদ্র তরঙ্গ দ্বারা ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আয়নে ভেঙে যায়। তাই একে আয়নোস্ফিয়ার বলে।
5.এক্সোস্ফিয়ার:
আয়োনোস্ফিয়ার বা থার্মোস্ফিয়ার এর ওপরের স্তরটিকে এক্সোস্ফিয়ার বলা হয়।
বিস্তার:
এই স্তর থার্মোস্ফিয়ার এর ওপরে অর্থাৎ 500 থেকে 750 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত।
বৈশিষ্ট্য:
1.এই স্তরে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়
(1200°- 1600°C)
2. এই স্তরে হিলিয়াম ও হাইড্রোজেন গ্যাসের প্রাধান্য দেখা যায়।
6.ম্যাগনেটোস্ফিয়ার:
এক্সোস্ফিয়ারের ঊর্ধ্বে বায়ুমণ্ডলের সর্বোচ্চ স্তর তথা শেষ সীমাকে ম্যাগনেটোস্ফিয়ার বলা হয়।
বিস্তার:
এই স্তরটি এক্সোস্ফিয়ার এর ঊর্ধ্বে অর্থাৎ 750 কিমি থেকে প্রায় 10,000 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত।
বৈশিষ্ট্য:
1.এই স্তরে সমস্ত বায়োবীয় উপাদান আয়নিত অবস্থায় থাকে এবং এখানকার উষ্ণতা প্রায় 2000°C ।
2. এই স্তরে প্রোটন ও ইলেকট্রন এর সমন্বয়ে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে, তাই একে ম্যাগনেটোস্ফিয়ার বলা হয়।
No comments:
Post a Comment