ভূমিরূপ প্রক্রিয়া(Geomorphic process):
যেসব প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া ভূপৃষ্ঠের রূপ অর্থাৎ পৃথিবীর বহিরঙ্গের পরিবর্তন ঘটায়, তাদের ভূমিরূপ প্রক্রিয়া(geomorphic process)বলে।
ভূমিরূপ গঠনকারী প্রক্রিয়া হল প্রধানত পার্থিব প্রক্রিয়া । পার্থিব প্রক্রিয়া বলতে ভূমিরূপ গঠনকারী সেই সমস্ত প্রক্রিয়া কে বোঝায় যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, ভূপৃষ্ঠ এবং ভূঅভ্যন্তরে সৃষ্টি হয় এবং কর্ম সম্পাদন করে।
ভূমিরূপ গঠনকারী পার্থিব প্রক্রিয়া দুই প্রকার যথা- 1.অন্তর্জাত প্রক্রিয়া এবং 2.বহির্জাত প্রক্রিয়া
অন্তর্জাত প্রক্রিয়া(Endogenous process):
শিলামন্ডল ও অভ্যন্তরের বিভিন্ন অংশে যে প্রাকৃতিক শক্তি প্রতিনিয়ত কাজ করে তাকে অন্তর্জাত শক্তি বলে । অন্তর্জাত শক্তি অভ্যন্তরে যে পদ্ধতিতে কাজ করেে, সেই পদ্ধতিকে অন্তর্জাত প্রক্রিয়া বলা হয়।
অন্তর্জাত প্রক্রিয়া অভ্যন্তরে আলোড়ন সৃষ্টি করে। এই আলোড়ন দুই প্রকার, যথা -
1.ধীর আলোড়ন 2. আকস্মিক আলোড়ন
ধীর আলোড়ন:
ভূ-অভ্যন্তরের সৃষ্ট ধীরগতিসম্পন্ন যেসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ত্বকের পরিবর্তন সাধিত হয়, তাকে ধীর আলোড়ন বলে।
ধীর আলোড়ন চার প্রকারের, যথা-
1.মহীভাবক আলোড়ন
2.গিরিজনি আলোড়ন
3.ইউস্ট্যাটিস্টিক সঞ্চালন
4.সমস্থিতিক আলোরন
- মহীভাবক আলোড়ন: যে ভূ-আলোড়ন আলোড়ন ভূপৃষ্ঠে উলম্বভাবে ক্রিয়া করে মহাদেশ গঠনে সাহায্য করে, তাকে মহীভাবক আলোড়ন বলে।
- গিরিজনি আলোড়ন: যে ভূ-আলোড়ন অনুভূমিকভাবে ক্রিয়া করে ভঙ্গিল পর্বত গঠনে সাহায্য করে, সেই আলোড়নকে গিরিজনি আলোড়ন বলে।
- ইউস্ট্যাটিস্টিক সঞ্চালন:সমুদ্রপৃষ্ঠের উত্থান-পতনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ভূমি ভাগের নিমজ্জন বা উত্থান।
- সমস্থিতি আলোড়ন: অভিকর্ষজনিত ভারসাম্যের অবস্থায় শিলার বেধ ও ঘনত্ব অনুযায়ী পাহাড়, মালভূমি, সমভূমি প্রভৃতি ভূপ্রাকৃতিক একক গুলির উচ্চতার বৈশিষ্ট্য বজায় রাখা।
আকস্মিক আলোড়ন:
ভূ-অভ্যন্তরে সৃষ্ট দ্রুতগতিসম্পন্ন যে সব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভূত্বকের আকস্মিক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়, তাকে আকস্মিক আলোড়ন বলে ।
আকস্মিক আলোড়ন দু'ধরনের যথা-
1.ভূমিকম্প এবং 2.অগ্ন্যুৎপাত
- ভূমিকম্প: চোখে দেখা যায় না এমন কোনো কারণে ভূপৃষ্ঠে কিছু অংশ কিছুক্ষণের জন্য মৃদু অথবা প্রবলবেগে কেঁপে উঠলে, তাকে ভূমিকম্প বলে । ভূমিকম্পের ফলে চু্্যতি, ফাটল, দারণ প্রভৃতি সৃষ্টি হয়।
- অগ্নুৎপাত: ভূপৃষ্ঠের কোন দুর্বল স্থান ভেদ করে ভূ-অভ্যন্তরের উত্তপ্ত গলিত পদার্থ, জলীয়বাষ্প, গলিত শিলা প্রভৃতি প্রবল বেগে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভূত্বকের ওপর দিয়ে উৎক্ষিপ্ত হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়াকে অগ্নুৎপাত বলে ।অগ্নুৎপাত এর ফলে আগ্নেয়গিরি ও লাভা মালভূমির সৃষ্টি হয়।
বহির্জাত প্রক্রিয়া(Exogenous process):
ভূপৃষ্ঠে ও উপ উপপৃষ্ঠীয় অংশে যে প্রাকৃতিক শক্তি প্রতিনিয়ত কাজ করে তাকে, বহির্জাত শক্তি বলে। বহির্জাত শক্তি ভূপৃষ্ঠে এবং উপপৃষ্ঠীয় এলাকায় যে পদ্ধতিতে নগ্নীভবন ঘটায়, সেই পদ্ধতিকে বহির্জাত প্রক্রিয়া বলা হয়।
যেমন- নদী, হিমবাহ, সমুদ্রতরঙ্গ, বায়ু, ভৌম জলের কাজ, অববাহিকা ইত্যাদি।
বহির্জাত প্রক্রিয়া চারধরনের যথা-
1.পর্যায়িতকরণ বা পর্যায়ন প্রক্রিয়া
2.অবরোহন বা ক্ষয়সাধন
3.আরোহন বা স্তুপীকরণ বা সঞ্চয়সাধন
4.আবহবিকার
বহির্জাত প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রক:
জলবায়ুর পরিবর্তনশীল প্রকৃতি
ভূমির ঢালের পরিমাণ
শিলার প্রকৃতি
মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্রিয়াকলাপ
বহির্জাত প্রক্রিয়ার পদ্ধতি সমূহ:
পর্যায়িতকরণ বা পর্যায়ন প্রক্রিয়া:
যে বহির্জাত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষয়, পরিবহন ও সঞ্চয় কাজে সামঞ্জস্য আসে তাকে, পর্যায়িতকরণ বা পর্যায়ন বলে। নদী, হিমবাহ, বায়ু ও সমুদ্রতরঙ্গ হলো পর্যায়ন প্রক্রিয়া প্রধান মাধ্যম।
অবরোহন বা ক্ষয়সাধন:
যে বহির্জাত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠের উপর কোন উচু জায়গায় ক্রমাগত ক্ষয় এর মাধ্যমে সমতলভূমিতে পরিণত হয়, তাকে অবরোহন বা ক্ষয়সাধন বলে।
আরোহন বা স্তুপীকরণ বা সঞ্চয়সাধন:
যে বহির্জাত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষয়জাত পদার্থ ভূপৃষ্ঠের নিচু অংশে পরিবহন মাধ্যমে থেকে অধঃক্ষিপ্ত হয় ও সঞ্চিত হয়, তাকে আরোহন বা স্তুপীকরণ বা সঞ্চয়সাধন বলে।
আবহবিকার:
যে একধিক প্রক্রিয়া একত্রে ভূপৃষ্ঠে বা ভূপৃষ্ঠের কাছে কোন স্থানের শিলাকে সেখানেই চূর্ণ-বিচূর্ণ বা বিয়োজিত করে, তাকে আবহবিকার বলে।
অববাহিকা তিন প্রকার যথা-
1.যান্ত্রিক বা ভৌত আবহবিকার
2.রাসায়নিক আবহবিকার
3. জৈব-রাসায়নিক আবহবিকার
যান্ত্রিক বা ভৌত আবহবিকার:যান্ত্রিক আবহবিকার বলতে শিলাস্তরে চাপের হাস-বৃদ্ধি, উষ্ণতার দ্রুত পরিবর্তন, কেলাস গঠন, জৈবিক কার্যাবলী ইত্যাদির প্রভাবে ভূপৃষ্ঠের শিলায় ভৌত পরিবর্তন ঘটিয়ে শিলার বিচূর্ণনকে বোঝায়।যান্ত্রিক আবহবিকার এর ফলে প্রস্তর চাঁই খন্ডিকরন, শল্কমোচন, ক্ষুদ্রকণা বিস্মরণ, কলয়েড উৎপাঠন প্রভৃতি তাপ প্রক্রিয়ায় শিলার বিচূর্ণীভবন ঘটে।রাসায়নিক আবহবিকার:অম্ল (এসিড),জল, অক্সিজেন ইত্যাদির প্রভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শিলা বিয়োজিত হলে, তাকে রাসায়নিক আবহবিকার বলে ।পাঁচটি প্রক্রিয়ায় রাসায়নিক আবহবিকার ঘটে।যথা-1.জলযোজন2.আদ্র-বিশ্লেষণ3.জারণ4.অঙ্গারন5.দ্রবনজৈব-রাসায়নিক আবহবিকার:জৈব পদার্থ বিয়োজিত হলে জৈবিক অম্ল উৎপাদিত হয়, তার সাহায্যে শিলার বিয়োজনকে জৈব-রাসায়নিক আবহবিকার বলে। যেমন- ব্যাসল্ট , ট্রাকইড প্রভৃতি শিলা জৈবিক অম্লের প্রভাবে বিয়োজিত হয়।
ভূমিরূপ গঠনে মানব প্রক্রিয়া:
পার্থিব প্রক্রিয়া ছাড়াও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতিকে অবলম্বন করে মানুষ নিজেও ভূপৃষ্ঠের রূপ প্রতিনিয়ত বদল করে চলেছে। ফলে আধুনিককালে মানুষের কাজও ভূমিরূপ প্রক্রিয়া অবিভাজ্য অঙ্গ। নদীতে বাঁধ বেধে, উপকূল রক্ষার জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং কাঠামো নির্মাণ করে, পাহাড়ে চাষাবাদের জন্য ধাপ কেটে, রাস্তাঘাট নির্মাণ করে, নিচু জমি ভরাট করে মানুষ ভূপৃষ্ঠের ঢাল ও আকৃতির বিন্যাস খুব অল্পসময়ে বদলে দিতে সমর্থ হয়েছে। বস্তুত, এই একই কাজ যদি প্রাকৃতিক শক্তি গুলি করতে পারত, তাহলে কয়েক শত বা কয়েক হাজার বছর সময় লাগত।
ভূমিরূপ গঠনে অপার্থিব বা মহাজাগতিক প্রক্রিয়া:
মহাকাশ থেকে ছুটে আসা উল্কা কখনো কখনো ভূপৃষ্ঠে আঘাত করে গর্তের সৃষ্টি করে । ফলে ভূমির রূপগত বদল ঘটে। যেমন- আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা প্রদেশের মিটিওর কেটার ।
No comments:
Post a Comment