Saturday, August 8, 2020

শিলা (আগ্নেয় শিলা ,পাললিক শিলা, রূপান্তরিত শিলা)

শিলা(Rock):

পৃথিবী যে শক্ত আবরণে ঢাকা তা হলো শিলা। শিলা আসলে প্রকৃতিতে প্রাপ্ত এক বা একাধিক খনিজের সমসত্ত্ব বা অসমসত্ত্ব মিশ্রণ। আর যে খনিজ দিয়ে শিলা গঠিত হয় তা হল এক বা একাধিক অজৈব মৌলিক পদার্থের যৌগ। যেমন- গ্রানাইট শিলা কোয়াটজ ,ফেল্ডসপার, মাইকা ও হনর্ব্লেন্ড খনিজে দ্বারা গঠিত। আবার চুনাপাথর শুধুমাত্র ক্যালসাইট অথবা আ্যরাগোনাইট খনিজ দিয়ে গঠিত। 

প্রকৃতিতে বিভিন্ন রকমের শিলা দেখতে পাওয়া যায় । এদের সৃষ্টি আর বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে শিলাকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
1.আগ্নেয় শিলা 
2.পাললিক শিলা
3.রূপান্তরিত শিলা



আগ্নেয় শিলা(Igneous Rock):

পৃথিবী সৃষ্টির সময় উত্তপ্ত ও তরল অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে তাপ বিকিরণ করে ভূত্বকের মধ্যে ও ওপরে প্রথমে যে কঠিন শিলার সৃষ্টি হয়, সেটি হলো আগ্নেয় শিলা।পৃথিবীতে প্রথম সৃষ্টি হওয়ায় এই শিলার আরেক নাম প্রাথমিক শিলা। ভূ-অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধাতব পদার্থ যেমন- সিলিকন, লোহা, নিকেল, ম্যাগনেসিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম প্রভৃতি উত্তপ্ত ও গলিত অবস্থায় ম্যাগমা রূপে থাকে। এই ম্যাগমা অভ্যন্তরের প্রবল চাপে লাভা রূপে ভূপৃষ্ঠে উঠে এসে বা ভূ-অভ্যন্তরেই ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে জমাট বেঁধে আগ্নেয় শিলার সৃষ্টি করে ।
উৎপত্তি  অনুসারে আগ্নেয় শিলাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয় । যথা-
1. নিঃসারী আগ্নেয় শিলা 
2. উদবেধী আগ্নেয় শিলা

নিঃসারী আগ্নেয় শিলা:
ভূ-অভ্যন্তরের অত্যধিক চাপে উত্তপ্ত গলিত ম্যাগমা ভূত্বকের কোন দুর্বল এর মধ্য দিয়ে ভূপৃষ্ঠে লাভা রূপে এসে শীতল ও কঠিন হয়ে যে আগ্নেয় শিলা সৃষ্টি করে তার নাম নিঃসারী আগ্নেয় শিলা। খুব দ্রুত জমাট বেঁধে গঠিত হয় বলে এর দানাগুলো বেশ সূক্ষ্ম হয়। যেমন- ব্যাসল্ট শিলা, অবসিডিয়ান
উদবেধী আগ্নেয় শিলা:
ভূ-অভ্যন্তরের গলিত ম্যাগমা ভূত্বকের দুর্বল ফাটল বা  ছিদ্রের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে না পেরে অভ্যন্তরেই ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে উদবেধী আগ্নেয়শিলার সৃষ্টি করে। যেমন- গ্রানাইট,ডোলেরাইট। উদবেধী আগ্নেয় শিলা আবার দুরকমের হয়। যথা-1.উপপাতালিক 2.পাতালিক
  • উপপাতালিক শিলা: ম্যাগমা ভূ-অভ্যন্তরের কোন ফাটল বা ছিদ্রপথে ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে জমাট বেঁধে সৃষ্টি করে, উপপাতালিক শিলা। যেমন-ডোলেরাইট। 
  • পাতালিক শিলা: ম্যাগমা ভূ-অভ্যন্তরের একবারে তলদেশে অতি ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে সৃষ্টি করে পাতালিক শিলা ।ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে জমাট বেঁধে বলে এই শিলার দানাগুলো কিছুটাাা স্থূল হয়। যেমন- গ্রানাইট। 


আগ্নেয় শিলার বৈশিষ্ট্য:
1.আগ্নেয় শিলা উত্তপ্ত পদার্থ জমাট বেঁধে সৃষ্টি হয় বলে এই শিলা কাঁচের মতো স্ফটিকাকার হয় । 
2.আগ্নেয় শিলায় কোন স্তর থাকে না, তাই একে অস্তর ভুত শিলাও বলে। 
3.আগ্নেয় শিলা কঠিন বলে সহজে ক্ষয় হয় না ও অপ্রবেশ্য। 
4.আগ্নেয় শিলায় জীবাশ্ম দেখা যায় না। 
5.আগ্নেয় শিলার উপাদানগুলি দৃঢ় ও সঙ্ঘবদ্ধ ।  সহজে রাসায়নিক আবহবিকার এর দ্বারা আক্রান্ত হয় না। 
6.আগ্নেয় শিলায় উলম্ব দারণ ও ফাটল দেখা যায়, তাই প্রবেশ্যতা বেশি। 

পাললিক শিলা(Sedimentary Rock):

আগ্নেয় শিলা বহুদিন ধরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ক্ষয়কারী শক্তি যেমন- নদী, হিমবাহ, বায়ু, সমুদ্রতরঙ্গ প্রভৃতির প্রভাবে উৎস স্থান থেকে ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত ও পরিবাহিত হয়ে কোন সমুদ্র, হদ বা নদীর তলদেশে জমা হতে থাকে। এইভাবে বছরের-পর-বছর ক্ষয়প্রাপ্ত পদার্থগুলো স্তরে স্তরে সঞ্চিত হয় এবং চাপের ফলে জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে পাললিক শিলার সৃষ্টি করে। এই শিলার মধ্যে বালি, পলি ও কাদার ভাগ বেশি থাকে। পলি জমাট বেঁধে সৃষ্টি হওয়ায় এর নাম পাললিক শিলা। যেমন-চুনাপাথর, বেলেপাথর, কাদাপাথর। 

পলির উৎপত্তি অনুসারে পাললিক শিলা কে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-
 1.সংঘাত ও 2.অসংঘাত
সংঘাত শিলা:
প্রাচীন শিলা চূর্ণ-বিচূর্ণ ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বহুদিন ধরে জমাট বেঁধে যে শিলার সৃষ্টি করে তা হল সংঘাত শিলা। 
অসংঘাত শিলা:
রাসায়নিক উপায় বা জৈবিক উপায়ে সৃষ্ট শিলা হল অসংঘাত শিলা যেমন-চুনাপাথর, লবণ শিলা। 

এছাড়াও যান্ত্রিক উপায়ে গঠিত পাললিক শিলা তিন প্রকারের।যথা- 
1.চুনাপাথর 
2.বেলেপাথর 
3.কাদাপাথর


পাললিক শিলার বৈশিষ্ট্য:
1.স্তরায়ন পাললিক শিলার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এই  শিলা তে তীর্যক, সমান্তরাল ও মিশ্র স্তরায়ন দেখা যায়। 
2.জীবাশ্ম পাললিক শিলা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। একমাত্র এই শিলাতেই  র্জীবাশ্ম দেখা যায়। 
3.পাললিক শিলাতে সমুদ্রতরঙ্গের চিহ্ন, বৃষ্টির চিহ্ন প্রভৃতি দেখা যায় । 
4.কয়লা , খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডার এই পাললিক শিলা। 
5.এই শিলায় সচ্ছিদ্রতা ও ভঙ্গুরতা দেখা যায়। 
6.এই শিলার প্রবেশ্যতা খুব বেশি। 
জীবাশ্ম(Fossil):
স্তরে স্তরে জমাট বেঁধে পাললিক শিলা সৃষ্টির সময় কখনও কখনও সামুদ্রিক উদ্ভিদ বা প্রাণী তার মধ্যে চাপা পড়ে যায়। পরে পাললিক শিলার মধ্যে ওই উদ্ভিদ বা প্রাণীর দেহে প্রস্তরীভূত হলে তাদের দেহাবশেষের ছাপ থেকে যায়। একে বলে জীবাশ্ম । 

রূপান্তরিত শিলা(Metamorphic Rock):

আগ্নেয় ও পাললিক শিলা ভূঅভ্যন্তরের প্রচন্ড চাপ, তাপ, নানা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে তার পুরনো ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম হারিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধর্ম বিশিষ্ট শিলায় পরিণত হয়। একেই বলে রূপান্তরিত শিলা। অনেকভাবেই শিলার রূপান্তর হতে পারে। যেমন- 1.অধিক তাপে (কয়লা থেকে গ্রাফাইট) 2.প্রচন্ড চাপে (শেল থেকে সিলেট) 3.রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ( অ্যন্্ডালুসাইট থেকে  সিলিমেনানাইট ) । 
প্রধানত চাপের ফলে বিশাল অঞ্চল জুড়ে শিলার আঞ্চলিক বা ব্যাপক রূপান্তর ঘটে। যেমন- সেলেট।  স্পর্শ বা তাপের ফলে শিলার  স্পর্শ বা স্থানীয় রূপান্তর হয়ে থাকে । যেমন- মার্বেল


রূপান্তরিত  শিলার বৈশিষ্ট্য:
1.রূপান্তরের ফলে আগ্নেয় বা পাললিক শিলা অনেক বেশি কঠিন হয়ে যায়। 
2.আগ্নেয় শিলার রূপান্তরিত হলে তা আগের তুলনায় আরো মসৃণ, চকচকে ও কেলাসিত হয়ে যায়। 
3.পাললিক শিলার রূপান্তরিত হলে তার ভঙ্গুরতা কমে যায়। 
4. আগ্নেয় শিলা রূপান্তরিত হয়ে ভেতরকার খনিজ পৃথক হয়ে পড়ে, তাই এখানে খনিজ সংগ্রহে সুবিধা হয়।
5.প্রচন্ড তাপে ও চাপে পাললিক শিলার জীবাশ্ম গুলি নষ্ট হয়ে যাই বলে রূপান্তর শিলা জীবাশ্মহীন। 

No comments:

Post a Comment

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়: ১.ভূমিক্ষয় রোধ করা: মরু প্রান্তীয় এলাকায় মাটি ক্ষয় রোধ করতে ঢালু এলাকায় সমোন্নতিরেখা চাষ, বায়ুরোধক দেয়া...