পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত স্তরগুলিকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় , যথা-
1. ভূত্বক ( Crust )
2. গুরুমণ্ডল ( Mantle )
3. কেন্দ্রমণ্ডল ( Core )
ভূগর্ভের এই বিভিন্ন স্তরগুলির প্রকৃতি , উয়তা , ঘনত্ব ও চাপ ভূকম্প তরঙ্গের গতিবেগের পার্থক্যের মাধ্যমে বােঝা যায় ।
ভূত্বক ( Crust )
সংজ্ঞা : সবার ওপরে অবস্থিত হালকা ও কঠিন পদার্থে গঠিত যে স্তরটি পৃথিবীকে শক্ত আবরণে মুড়ে রেখেছে , তাকে ভূত্বক বা ক্রাস্ট বলে । ।
বৈশিষ্ট্য :
1) গভীরতা : মহাদেশের নীচে গড়ে 60 কিমি এবং মহাসাগরের নীচে গড়ে 5 কিমি গভীরতা পর্যন্ত ভূত্বক বিস্তৃত । এর গড় গভীরতা প্রায় 30 কিমি ।
2) উপাদান : ভূত্বকের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে রয়েছে অক্সিজেন ( O2 ) । এ ছাড়া সিলিকন ( Si ) , ম্যাগনেশিয়াম ( Mg ) , অ্যালুমিনিয়াম ( AI ) প্রভৃতি উপাদানে ভূত্বক গঠিত ।
3) উন্নতা বা তাপমাত্রা : পৃথিবী তাপ বিকিরণ করে গ্যাসীয় অবস্থা থেকে ক্রমশ শীতল হয়ে তরল হয় । তরল অবস্থা থেকে ক্রমশ শীতল হয়ে পৃথিবীর উপরিভাগের এই কঠিন আবরণটি সৃষ্টি হয় । ভূ - অভ্যন্তরের তিনটি স্তরের মধ্যে এই স্তরটির উন্নতা সবচেয়ে কম । ভূত্বকের গড় তাপমাত্রা 15°C ।
4) ঘনত্ব : ভূত্বক সবচেয়ে হালকা । এর ঘনত্ব 2 . 2 - 2 . 9 গ্রাম / ঘনসেমি ।
5) শিলা : ভূত্বক আগ্নেয় , পাললিক ও রূপান্তরিত এই তিন প্রকার শিলা দিয়ে গঠিত । এই শিলা নানা খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ । ভূত্বকের একেবারে ওপরে আছে মাটি ।
6) উপস্তর : ভূত্বকের দুটি অংশ । যথা —
A) সিয়াল : সিলিকন ( Si ) ও অ্যালুমিনিয়াম ( AI ) দ্বারা গঠিত ওপরের অপেক্ষাকৃত হালকা স্তরটি হল সিয়াল ( Si + A = Sial ) বা মহাদেশীয় ভূত্বক । এটি গ্রানাইট জাতীয় শিলায় গঠিত এবং মহাসাগরের নীচে অনুপস্থিত ।
B) সিমা : সিলিকন ( Si ) ও ম্যাগনেশিয়াম ( Mg ) দ্বারা গঠিত অপেক্ষাকৃত ভারী স্তরটি হল সিমা ( Si + Ma = Sima ) বা মহাসাগরীয় ভূত্বক । এটি ব্যাসল্ট জাতীয় শিলায় গঠিত এবং সিয়ালের নীচে অবস্থিত ।
7) বিযুক্তিরেখা : ভূত্বকের সিয়াল ও সিমার মাঝে রয়েছে । কনরাড বিযুক্তিরেখা এবং ভূত্বককে গুরুমণ্ডল থেকে পৃথক করেছে মােহােরাভিসিক বিষক্তিরেখা ।
গুরুমণ্ডল(Mantle)
সংজ্ঞা : ভূত্বকের নীচ থেকে পৃথিবীর অভ্যন্তরে কেন্দ্রমণ্ডলের ঊর্ধ্বভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় একই ঘনত্বযুক্ত স্তরকে গুরুমণ্ডল বা ম্যান্টেল বলে ।
বৈশিষ্ট্য :1) গভীরতা : ভূত্বকের নীচ থেকে প্রায় 2 , 900 কিমি গভীরতা পর্যন্ত গুরুমণ্ডল বিস্তৃত ।
2) উপাদান : এই স্তরের প্রধান উপাদান লােহা ( Fe ) , নিকেল ( Ni ) , ক্রোমিয়াম ( Cr ) , ম্যাগনেশিয়াম ( Mg ) ও সিলিকন ( Si ) ।
3) উম্নতা : এই স্তরের উয়তা 2000°c - 3000°C । •
4) ঘনত্ব : এখানে পদার্থের ঘনত্ব 3 . 4 – 5 . 6 গ্রাম / ঘনসেমি ।
5) উপত্তর : গুরুমণ্ডলের দুটি স্তর । যথা-
বহিঃগুরুমণ্ডল : গুরুমণ্ডলের 30 - 700 কিমি পর্যন্ত অংশে ক্রোমিয়াম ( Cr ) , লােহা ( Fe ) , সিলিকন ( Si ) ও ম্যাগনেশিয়ামের ( Mg ) প্রাধান্য দেখা যায় বলে একে ক্রোফেসিমা ( Crofesima ) বলে ।
অন্তঃগুরুমণ্ডল : 700 – 2 , 900 কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত অংশে নিকেল ( Ni ) , লােহা ( Fe ) , সিলিকন ( Si ) ও ম্যাগনেশিয়ামের ( Mg ) আধিক্যের জন্য একে নিফেসিমা ( Nifesima ) বলে ।
6) বিযুক্তিরেখা : গুরুমণ্ডল মােহােরাভিসিক বিযুক্তিরেখা দ্বারা ভূত্বক থেকে এবং গুটেনবার্গ বিযুক্তিরেখা দ্বারা কেন্দ্রমণ্ডল থেকে বিচ্ছিন্ন । আর বহিঃগুরুমণ্ডল ও অন্তঃগুরুমণ্ডলের সঙ্গে রয়েছে রেপিত্তি বিযুক্তিরেখা ।
কেন্দ্রমণ্ডল ( Core )
সংজ্ঞা : গুরুমণ্ডলের নীচে এবং পৃথিবীর কেন্দ্রের চারদিকে বেষ্টনকারী সর্বাধিক ঘনত্বযুক্ত স্তরকে কেন্দ্রমণ্ডল বা কোর বলে ।
বৈশিষ্ট্য :
1 ) গভীরতা : গুরুমণ্ডলের নীচে 2 , 900 কিমি থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র 6 , 370 কিমি গভীরতা পর্যন্ত কেন্দ্রমণ্ডল বিস্তৃত । অর্থাৎ , এই স্তরটি প্রায় 3 , 470 কিমি পুরু ।
2 ) উপাদান : এই স্তর অত্যন্ত ভারী নিকেল ( Ni ) ও লােহা । ( Fe ) দিয়ে গঠিত বলে একে নিফে ( Nife ) বলে ।
3 ) উষ্ণতা : এই স্তরের গড় উষ্ণতা প্রায় 5000°C ।
4 ) ঘনত্ব : এই স্তরের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি । গড় ঘনত্ব প্রায় 9 . 1 - 13 . 1 গ্রাম / ঘনসেমি ।
5 ) উপস্তর : বিজ্ঞানীরা কেন্দ্রমণ্ডলকে দুটি অংশে ভাগ । করেছেন ।
বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল : 2 , 900 – 5 , 100 কিমি গভীরতায় রয়েছে বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল । এর চাপ , তাপ ও ঘনত্ব অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলের তুলনায় কম হওয়ায় এখানে পদার্থ অর্ধকঠিন অবস্থায় আছে ।
অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল : পৃথিবীর কেন্দ্রের চারদিকে বেষ্টন । করে রয়েছে অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল । এর গভীরতা 5 , 100 – 6 , 370 তরের চাপ , তাপ ও ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি । অত্যধিক চাপে পদার্থগুলি এখানে কঠিন অবস্থায় আছে ।
6 ) বিযুক্তিরেখা : গুটেনবার্গ বিযুক্তিরেখা দ্বারা কেন্দ্রমণ্ডল গুরুমণ্ডল থেকে আলাদা হয়েছে । বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল ও অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলের মাঝে রয়েছে লেহম্যান বিযুক্তিরেখা ।
আমারা রাতের আকাশে যে তাঁরা দেখি আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগেও মানুষ সূর্য, তারা, উল্কা, ছায়াপথ, ধূমকেতু ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে তাদের সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করতো । সেই সময় আজকের মত বিজ্ঞান এত উন্নত ছিলনা । ঘড়ি, ক্যালেন্ডার, কম্পাসও ছিলনা । চাঁদ ও সূর্যের চলাচল দেখে দিন, দিক, মাস, সময়, বছর গণনা করা হত । সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মোটামুটি উপরের দিকে ১০০০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত যে শূন্যস্থান আছে তাকে আকাশ বলা হয় । পৃথিবী ছাড়িয়ে রাতের আকাশে তাকালে যতদূর দেখা যায় সেই বিশাল ফাঁকা শূন্যস্থান কে মহাকাশ বলে ।
মহাবিশ্ব :
মহাবিশ্ব সৃষ্টি নিয়ে বহু মতভেদ আছে । আধুনিক মত অনুসারে মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থ একটি বালির কণার থেকেও ছোটো অবস্থায় ছিল । প্রায় 1400 কোটি বছর আগে প্রচুর তাপ ও শক্তি নিয়ে এর প্রসারণ শুরু হয় । সেই সঙ্গে প্রচুর গ্যাসের মহাজাগতিক মেঘ ও ধূলিকণা তৈরি হয় । কোটি কোটি বছর ধরে এই গ্যাস আর মেঘ থেকে তৈরি হয় নীহারিকা,ছায়াপথ, গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, উল্কা, ধূমকেতু ইত্যাদি । মহাকাশের পরিসীমা ঠিক কতদূর সেটা মানুষের কল্পনার বাইরে । অর্থাৎ আমরা পৃথিবীর মানুষ মহাবিশ্ব সম্বন্ধে খুব সামান্যই জানতে পেরেছি।
মহাকাশে রয়েছে বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু ।
এগুলি হল - গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ, উল্কা, ধূমকেতু নীহারিকা ইত্যাদি । এখন আমরা এগুলি সম্বন্ধে কিছু কথা জেনে নেব ।
1.নীহারিকা –
মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় অসংখ্য ধূলিকণা গ্যাসের মহাজাগতিক মেঘ তৈরি হয় তা হল নীহারিকা । মহাবিশ্ব সৃষ্টির প্রায় ১০ লক্ষ বছর পর গ্যাসীয় পদার্থগুলি জমাট বেঁধে প্রচণ্ড গতিতে একে অপরের সাথে মিলে জ্বলন্ত নক্ষত্রের জন্ম দেয় । এই নীহারিকা থেকে নক্ষত্রদের জন্ম হয়েছে ।
2.ছায়াপথ –
মহাকাশের এক এক জায়গায় লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি তারা ও গ্যাসীয় বস্তু মিলে একটি বিশাল তারা জগত গড়ে তোলে, একে ছায়াপথ বলে । ছায়াপথ গুলি ডিম্বাকার, প্যাঁচালো ইত্যাদি নানা রকম হয় । খালি চোখে আমরা যে তারা দেখি সেগুলি আকাশগঙ্গা ছায়াপথের তারা । প্রায় ১০ হাজার কোটি নক্ষত্র, ধূলিকণা, গ্যাস মিলে আকাশগঙ্গা একটি বিরাট প্যাঁচানো ছায়াপথ । সূর্য, পৃথিবী ও অন্য গ্রহগুলি এই আকাশগঙ্গা ছায়াপথে রয়েছে ।
2.নক্ষত্র ও নক্ষত্রমণ্ডল –
যে সব জ্যোতিষ্কের নিজের আলো ও উত্তাপ আছে তাদের নক্ষত্র বলে । সূর্য নক্ষত্র আছে আমাদের থেকে ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে আছে । তারপর রয়েছে ৪১ লক্ষ কোটি কিলোমিটার দূরে নক্ষত্র প্রক্সি-মা সেন্তাউরি । জ্যোতির্বিজ্ঞানিরা মহাবিশ্বের বিভিন্ন নক্ষত্র ‘আলোকবর্ষ’ একক দিয়ে দূরত্ব পরিমাণ করেন । ১ সেকেন্ডে আলোর গতি প্রায় ৩০০,০০০ কিলোমিটার । এই হিসাবে আলো এক বছরে যত দূরত্ব অতিক্রম করে সেটাই হল আলোকবর্ষ । মনেকরা হয় যে নক্ষত্র গুলি নীহারিকা থেকে সৃষ্টি হয়েছে । নক্ষত্রদের রং দেখে আমরা সেই নক্ষত্র কতটা উত্তপ্ত অনুমান করতে পারি । লাল রঙের নক্ষত্রের উষ্ণতা সবথেকে কম, মাঝারি হলুদ নক্ষত্রের উষ্ণতা একটু বেশি । নীল নক্ষত্রের উষ্ণতা আরও একটু বেশি । সাদা রঙের নক্ষত্রের উষ্ণতা সবথেকে বেশি । অনেক নক্ষত্র কাছাকাছি অবস্থান করে, তাদের কাল্পনিক রেখা দিয়ে যোগ করলে বিভিন্ন আকৃতি গঠিত হয় । এদেরকে বলা হয় নক্ষত্রমণ্ডল । উত্তর আকাশে সাতটি নক্ষত্রের সমষ্টিকে সপ্তর্ষিমণ্ডল বলে । তাঁদের নাম প্রাচীনকালের সাত জন ঋষির নাম অনুসারে রাখা হয়েছে । এদের দেখতে অনেকটা ? চিহ্নের মত হয় । আবার ইংরেজি M অক্ষরের মত ক্যাসিওপিয়া । ক্রস চিহ্নের মত হল বকমণ্ডল । কালপুরুষ নক্ষত্র মণ্ডলকে পুরাকালের একজন বীর শিকারি হিসাবে কল্পনা করা হয়েছে । ধ্রুব তারাকে সারাবছর উত্তর আকাশে একই স্থানে দেখা যায় ।
3.গ্রহ ও উপগ্রহ –
যে সমস্ত জ্যোতিষ্কের নিজের আলো ও উত্তাপ নেই, যারা নক্ষত্রের আলোয় আলোকিত হয় তাদের গ্রহ বলে । আবার গ্রহদের চারিদিকে যারা ঘোরে তাদের উপগ্রহ বলে । উপগ্রহরা আলো নক্ষত্রদের কাছ থেকে পায় । সূর্যের চারিদিকে আবর্তন করে ৮ টি গ্রহ । এগুলি হল – বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, উরেনাস ও নেপচুন । চাঁদ হল পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ । চাঁদ তার আবর্তন ও পরিক্রমণ শেষ করে ২৭ দিন ৮ ঘণ্টায় । এছাড়াও অন্য গ্রহদের উপগ্রহ আছে । আগে প্লুটোকে গ্রহ হিসাবে ধরা হলেও এখন তাকে বামন গ্রহের তালিকায় রাখা হয়েছে ।
4.গ্রহাণুপুঞ্জ –
গ্রহের মত খুব ছোটো ছোটো জ্যোতিষ্ককে গ্রহাণুপুঞ্জ বলা হয় । এরাও এদের নির্দিষ্ট কক্ষপথে সূর্যের চারিদিকে ঘোরে । মঙ্গল ও বৃহস্পতির মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার গ্রহাণুপুঞ্জ রয়েছে । সৌরজগতের সবথেকে বড়ো গ্রহাণুপুঞ্জ হল সেরেস ।
5.ধূমকেতু –
ধূমকেতু হল মহাকাশের এক প্রকার জ্যোতিষ্ক । এটি দেখতে দীর্ঘ লেজ বিশিষ্ট বা অনেকটা ঝাঁটার মত হয় । ধূমকেতুর মাথার দিকটা উজ্জ্বল আর লেজের দিকটা হয় বাস্পময় । সূর্যের কাছাকাছি এলে ধূমকেতুর ধুলো গ্যাস জ্বলতে আরম্ভ করে । একে অনেক বছর পর পর দেখা যায় । পৃথিবী থেকে হ্যালির ধূমকেতু ৭৬ বছর পর দেখা যায় । শেষ বার দেখা গেছে ১৯৮৬ সালে, আবার দেখা যাবে ২০৬২ সালে ।
6.উল্কা –
আমরা মেঘহীন রাতের আকাশে হঠাৎ আলোর পিণ্ড নীচে নেমে আসতে দেখি । একে বলা হয় তারা খসা বা উল্কাপাত । ধূমকেতু, গ্রহাণুপুঞ্জের বা কোনও নক্ষত্রের ভাঙ্গা টুকরো পৃথিবীর আকর্ষণে পৃথিবীর দিকে প্রবল গতিবেগে ছুতে আসে । বাতাসের সাথে ঘষা লেগে এরা জ্বলতে শুরু করে । বেশিরভাগ উল্কা বাতাসে পুড়ে যায় । আবার কখনো বড়ো উল্কার অংশ পৃথিবীর বুকে আছরে পড়তে পারে ।
প্রতিদিন নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট সময় অন্তর পৃথিবীর সাগর মহাসাগর এর জলরাশির কোন স্থানে ফুলে ওঠা কে জোয়ার এবং কোন স্থানে নিচে নেমে যাওয়াকে ভাটা বলে। প্রধানত দুটি কারণে পৃথিবীর জোয়ার ভাটা সৃষ্টি হয়। যথা-
1.পৃথিবীর উপর চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণ বল
2.পৃথিবীর কেন্দ্রাতিগ বল এর প্রভাব
1.পৃথিবীর উপর চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণ বল:
নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের নিয়ম অনুসারে মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু পরস্পর পরস্পরকে আকর্ষণ করে। সুতরাং সূর্য ,পৃথিবী ও চাঁদ একে অপরকে আকর্ষণ করে । চাঁদ অপেক্ষা সূর্য প্রায় 260 লক্ষ গুণ ভারী । তাই চাঁদের তুলনায় সূর্যের আকর্ষণ ক্ষমতা অনেক বেশি। কিন্তু সূর্য পৃথিবী থেকে প্রায় 15 কোটি কিমি দূরে এবং চাঁদ রয়েছে পৃথিবী থেকে মাত্র 3 লক্ষ 84 হাজার কিমি দূরে । সূর্যের তুলনায় চাঁদ পৃথিবীর অনেক কাছে থাকায় পৃথিবীর উপর চাঁদের মহাকর্ষ শক্তি সূর্য অপেক্ষা প্রায় 2.2 গুন বেশি কার্যকরী। এই কারণে মূলত চাঁদের আকর্ষণেই জোয়ার সৃষ্টি হয় এবং সূর্যের আকর্ষণে সৃষ্ট জোয়ার মৃদু প্রকৃতির হয়। চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণে প্রবল ভরা জোয়ার সৃষ্টি হয়।
2.পৃথিবীর কেন্দ্রাতিগ বল এর প্রভাব :
আবর্তন গতির ফলে সৃষ্ট কেন্দ্রাতিগ বল দ্বারা প্রতিটি অনু মহাকর্ষ শক্তির বিপরীত দিকে বিকর্ষিত হয় । তবে পৃথিবীর যেদিকে চাঁদ থাকে সেদিকে কেন্দ্রাতিগ বল অপেক্ষা মহাকর্ষ বল বেশি প্রবল । কিন্তু এর ঠিক বিপরীত দিক (প্রতিপাদ স্থানে) চাঁদ থেকে অনেক দূরে থাকায় সেখানে মহাকর্ষ বল অপেক্ষা কেন্দ্রাতিগ বল বেশি প্রবল হয়। ফলের জোয়ার জোয়ার সৃষ্টি হয় ।
উপরোক্ত কারণে পৃথিবীর যে দুটো অংশে জোয়ারের সৃষ্টি হয় তার ঠিক সমকোণে অবস্থিত দুটি স্থান থেকে জল সরে জোয়ারের দিকে চলে যাওয়ায় জলতল নেমে গিয়ে ভাটার সৃষ্টি হয়।
মুখ্য জোয়ার বা প্রত্যক্ষ জোয়ার এবং গৌণ জোয়ার বা পরোক্ষ জোয়ার যেসব স্থানে সংঘটিত হয়, সেই সকল স্থানে জল সরবরাহ করতে গিয়ে ওই স্থান দুটির মধ্যবর্তী অঞ্চলে জল নেমে যায় । এরূপ জলতল নেমে যাওয়ার ফলে ভাটার সৃষ্টি হয়।
জোয়ার ভাটা সৃষ্টির অন্যান্য কারণ -
I. সমুদ্র সৈকতের ঢাল
ii. সমুদ্রের জলস্তরের ওঠানামা স্বাভাবিক সময়
iii. সমুদ্র জলরাশির উষ্ণতা
IV. সমুদ্র জলের ঘনত্ব ।
জোয়ার ভাটার ফলাফল:
মানবজীবনে সমুদ্র জলের জোয়ার ভাটার ফলাফল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই জোয়ার ভাটার প্রত্যক্ষ প্রভাব যেমন আছে তেমনি পরোক্ষভাবে প্রভাব লক্ষ্য করা যায় । যার ফলে কিছু সুবিধা পাওয়া যায়, আবার অসুবিধারও সম্মুখীন হতে হয়।
জোয়ার ভাটার সুবিধা:
নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির ফলে নৌ চলাচলের সুবিধা:
জোয়ারের সময় নদীর জলের পরিমাণ বেড়ে যায় । বিভিন্ন নদীর খাড়ির মুখ দিয়ে প্রচুর পরিমাণে জল অভ্যন্তর উপকূলে প্রবেশ করায় নদীর নাব্যতা বেশি হয় এবং নৌ চলাচলের সুবিধা হয়। জোয়ারের পানি জলতল 8 থেকে 10 মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। যেমন- হুগলি নদীর মাধ্যমে কলকাতা বন্দরে জাহাজ চলাচল।
আবর্জনামুক্ত নদীর গতিপথ:
ভাটার টানে নদী খাত থেকেই জলের সঙ্গে পলি ও আবর্জনা সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। ফলে, নদীর জল পরিষ্কার থাকে এবং নদীখাত গভীর হয়। যেমন- টেমস নদীর গতিপথ।
বন্দরে সুবিধা:
জোয়ারের জল প্রচুর পরিমাণে নদীখাতে প্রবেশ করায়, ওই খাতের বিস্তার ও গভীরতাও বেড়ে যায়, যা জাহাজ চলাচলের সুবিধা করে।
বরফ মুক্ত নদীবন্দর গঠন:
জোয়ারের লবণাক্ত জল শীতপ্রধান অঞ্চলের বন্দরগুলোতে সহজে বরফ জমতে দেয় না, বরং বরফ মুক্ত হতে সাহায্য করে।
জলবিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন:
জোয়ারভাটর শক্তিকে ব্যবহার করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে । যেমন- ভারতের করমন্ডল উপকূল, গুজরাট উপকূল, সুন্দরবন অঞ্চল এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিচ্ছে।
সামুদ্রিক মৎস্য সমাগমে মৎস্যজীবীদের সুবিধা:
বর্ষায় ডিম পাড়ার জন্য জোয়ারের জলের সঙ্গে বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ নদীর মোহনায় চলে এসে সেখানেই মাছের সমাগম ঘটায়, যার ফলে উপকূলের মৎস্য জীবীদের জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে সুবিধা হয়।
জোয়ার ভাটার অসুবিধা:
জল পানের ও জলসেচের অযোগ্য:
জোয়ারের জল নদী সাধু জলকে লবণাক্ত করে তোলে, যা পান করার ও সেচ কাজ করার ক্ষেত্রে অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
অগভীর নদীখাত সৃষ্টি:
কম খরস্রোতা নদীর নদীখাতে জোয়ার-ভাটা কম খেলে বলে নদীখাতে পলির ও আবর্জনার সঞ্চয় বেশি হয়, যা নদীখাতকে অগভীর করে তোলে। যেমন- হুগলি নদীর নদীখাত।
বানডাকা:
অতি শক্তিশালী তীব্র জোয়ার উপকূলবর্তী অঞ্চলকে প্লাবিত করে যাকে বানডাকা বলা হয়।
সম্পত্তি ও মানবীয় ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা:
উপকূলভাগ জোয়ারের জল দ্বারা প্লাবিত হয়ে ওই অঞ্চলের কৃষি জমিগুলি নষ্ট হয়ে যায়। প্রবল জল স্রোতে মানুষের সম্পত্তি, নৌকা বা লঞ্চডুবি হয়ে প্রান সংশয়ের সম্ভাবনা থাকে।
বদ্বীপ সৃষ্টিতে বাধা দান:
পলি ও আবর্জনা মুক্ত করাই নদীর মোহনায় বদ্বীপ গঠিত হয় না।
সাগর-মহাসাগরের জলরাশি নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট সময় অন্তর এক জায়গায় স্ফীত হয় বা ফুলে ওঠে এবং অন্য জায়গায় অবনমিত হয় বা নেমে যায় । জলরাশি এই স্ফীতি বা ফুলে ওঠাকে জোয়ার এবং অবনমন বা নামাকে ভাটা বলে।
জোয়ার সৃষ্টি কারণ:
প্রধানত দুটি কারণে জোয়ার সৃষ্টি হয়।
1.পৃথিবী নিজের মেরুরেখা চারিদিকে মেরুরেখার চারিদিকে অনবরত আবর্তন করে চলছে। এর ফলে ভূপৃষ্ঠে একটি বিকর্ষণ শক্তি বা কেন্দ্রাতিগ শক্তির সৃষ্টি হয় এবং তার জন্য ভূপৃষ্ঠের জলরাশি বাইরের দিকে বিক্ষিপ্ত হয় । এইভাবে সমুদ্রে জোয়ার সৃষ্টি হয়।
2.চাঁদ ও সূর্য উভয়ই পৃথিবীকে আকর্ষণ করে। তাই উভয়ের আকর্ষণই এই পৃথিবীতে জোয়ার হয়। তবে সূর্যের তুলনায় চাঁদ কাছে আছে বলে পৃথিবীর উপর চাঁদের আকর্ষণ বেশী । এর জন্য প্রধানত চাঁদেরআকর্ষনে পৃথিবীর জলরাশির ফুলে ওঠে এবং জোয়ার হয়।
ভাটা সৃষ্টির কারণ:
প্রধানত দুটি কারণে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টি হয়। যথা- 1.পৃথিবীর উপর চাঁদ ও সূর্যের আকর্ষণ বল
2.পৃথিবীর আবর্তন গতিজনিত কেন্দ্রাতিগ বল
জোয়ার ভাটার সময়ের ব্যবধান:
কোন নির্দিষ্ট স্থানে দুটি মুখ্য জোয়ারের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হয় 24 ঘণ্টা 48 মিনিট 45 সেকেন্ড এবং মুখ্য জোয়ার ও গৌণ জোয়ারের মধ্যে সময়ের ব্যবধান হয় 12 ঘন্টা 24 মিনিট 22.5 সেকেন্ড । আর এই হিসাব অনুসারে মুখ্য জোয়ারের স্থানে ভাটা সৃষ্টির সময় লাগে 6ঘন্টা 12 মিনিট 11সেকেন্ড পর ।
মুখ্য জোয়ার:
পৃথিবীর আবর্তনের সময় ভূপৃষ্ঠের যে অংশ চাঁদের ঠিক সামনে আসে, সেই জায়গার জলরাশি চাঁদের আকর্ষণে সবচেয়ে বেশি ফুলে ওঠে। তাই সেখানে যে জোয়ার হয় তাকে মুখ্য জোয়ার বলে।
গৌণ জোয়ার:
পৃথিবীর যে স্থানে মুখ্য জোয়ার হয় ঠিক তার বিপরীতদিকে বা প্রতিবাদ স্থানে পৃথিবীর কেন্দ্রাতিগ বল এর প্রভাবে এবং চাঁদের দিকে স্থলভাগের বেশি সরনের জন্য যে জলস্ফীতি বা জোয়ার হয় তাকে গৌণ জোয়ার বলে।
ভরা কটাল ও মরা কটাল:
অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে চাঁদ, সূর্য ও পৃথিবী একই সরলরেখায় অবস্থান করে বলে এই দুই তিথিতে প্রবল জোয়ার হয় , একে ভরা কোটাল বা ভরা জোয়ার বলে।
আর শুক্ল ও কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে পৃথিবীর অবস্থানের সাপেক্ষে চাঁদ ও সূর্য পরস্পর সমকোণে অবস্থান করে পৃথিবীকে আকর্ষণ করে বলে এই তিথিতে জোয়ারের প্রাবল্য কম হয় ।একে বলে মরা কটাল বা মরা জোয়ার।
সিজিগি:
জ্যোতিষ্কশাস্ত্র অনুযায়ী সিজিগি শব্দের অর্থ যোগবিন্দু । সূর্য ,পৃথিবী ও চাঁদের কেন্দ্রবিন্দু একই সরলরেখায় অবস্থান করলে তাকে সিজিগি বলে।
অ্যাপোজি পেরিজি :
পৃথিবীকে পরিক্রমণের সময় পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যে দূরত্ব যখন সবচেয়ে বেশি হয়, তখন চাঁদের সেই দূরতম অবস্থানকে বলে অ্যাপোজি । আর এই দূরত্ব যখন সবচেয়ে কম হয়, তখন চাঁদের সেই নিকটতম অবস্থানকে বলে পেরিজি।
বানডাকা:
জোয়ারের সময় স্ফীত সমুদ্রের জল মোহনা দিয়ে বড় বড় ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসের আকার এই নদী খাতে প্রবেশ করে। ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসসহ নদীর এই বিপরীতমুখী প্রবাহকে বান বলে । বর্ষাকালের নদীতে যখন বেশি জল থাকে, তখন ভরা কোটালের বা ভরা জোয়ারের জল খুব বেশি উঁচু হয়ে প্রবল বেগে সশব্দে নদীতে প্রবেশ করে ,একে বলে বানডাকা।
চান্দ্রমাস:
পৃথিবীকে একবার পরিক্রমণ করতে চাঁদের সময় লাগে 27 দিন 8 ঘন্টা । এই সময়কে চান্দ্রমাস বলে।
পৃথিবীব্যাপী সমুদ্রস্রোতের প্রভাব - Effects of Ocean Currents in the World
জলবায়ু, জীবজগৎ ও মানবজীবনের বিভিন্ন কর্মধারার ওপর সমুদ্রস্রোতের উল্লেখযোগ্য প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যথা-
জলবায়ুর ওপর প্রভাব:
1. উষ্ণতার ভারসাম্য:
সমুদ্রস্রোত নিরক্ষরেখা থেকে উভয় মেরুর দিকে উত্তাপের স্থানান্তর ঘটিয়ে মহাসমুদ্র তথা বিশ্বব্যাপী উষ্ণতার ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। তাই সমুদ্রস্রোতকে মহাসমুদ্রর উষ্ণতার নিয়ন্ত্রক বলা হয়।
2. উষ্ণতার তারতম্য:
সমুদ্রস্রোত উপকূলীয় অঞ্চলের আবহাওয়া ও জলবায়ুর ওপর যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। উষ্ণ সমুদ্রের প্রভাবে উপকূল অঞ্চলের উষ্ণতা বৃদ্ধি পায় এবং শীতল স্রোতের প্রভাবে উপকূল অঞ্চলের উষ্ণতা হ্রাস পায়। যেমন- উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের প্রভাবে নরওয়ের উত্তর পশ্চিম উপকূল বরফ মুক্ত থাকে। শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের প্রভাবে কানাডার কেইন শহরের উষ্ণতা শীতকালে -21.6°c পর্যন্ত নিচে নেমে যায়।
3.বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত:
উষ্ণ স্রোতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু জলীয় বাষ্প ধারণ করে স্থলভাগের ওপর প্রবাহিত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়। আবার শীতল স্রোতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু অতিরিক্ত শীতলতার কারণে তুষারপাত ঘটায়। যেমন- উষ্ণ উত্তর আটলান্টিক স্রোতের প্রভাবে ইংল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে বৃষ্টিপাত হয় এবং শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের প্রভাবে ল্যাব্রাডর উপকূলে তুষারপাত হয়।
4.দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া:
সাধারণত সমুদ্র উপকূলের যেসব অঞ্চলে উষ্ণ ও শীতল স্রোতের মিলন হয় বা বিপরীতমুখে পাশাপাশি প্রবাহিিত হয়, সেই সব অঞ্চলে উষ্ণতার পার্থক্যেের জন্য ঘন কুয়াশা ও ঝড়ঝঞ্জার সৃষ্টি হয়। যেমন- নিউ ফাউন্ডল্যান্ড উপকূলে উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোত ও শীতল ল্যাব্রাডর স্রোতের মিলনের ফলে এরূপ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সৃষ্টি হয়়।
5.মরু জলবায়ু সৃষ্টি:
মরুভূমি সৃষ্টির পেছনে সমুদ্রস্রোতের প্রভাব রয়েছে। ক্রান্তীয় অঞ্চলে মহাদেশ গুলির পশ্চিম উপকূল দিয়ে শীতল স্রোত প্রবাহিত হয় বলে বৃষ্টি তেমন হয় না, যার ফলে পশ্চিমাংশে মরুভূমি সম্প্রসারণ ঘটেছে ।
6.জলবায়ু পরিবর্তন:
পেরু চিলি উপকূলে এল নিনোর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম উপকূলে খরা সৃষ্টি হয় এবং পূর্ব উপকূলে অতিরিক্ত বৃষ্টির প্রভাবে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। লা-নিনার প্রভাবে বিপরীত ঘটনা ঘটে।
মানুষের অর্থনৈতিক পরিবেশের ওপর প্রভাব:
1.মগ্নচড়া সৃষ্টি ও মৎস্য ক্ষেত্রের বিকাশ:
শীতল স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা হিমোশৈল উষ্ণস্রোত েের সংস্পর্শে গলে যায়। এই হিমোশৈল গলিত পদার্থ অধঃক্ষিপ্ত হয়ে অগভীর মগ্নচড়ার সৃষ্টি হয় ।যেমন- গ্র্যান্ড ব্যাংক, ডগার্স ব্যাঙ্ক প্রভৃতি। এই মগ্নচড়া অঞ্চল এবং অন্যান্য উষ্ণ ও শীতল স্রোত এর মিলন অঞ্চলে অনুকুল উষ্ণতা কারণে মাছের খাদ্য প্লাংটন প্রচুর পরিমাণে জন্মায় । এর ফলে এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক মৎস্য ক্ষেত্রের বিকাশ ঘটেছে । যেমন- জাপান উপকূলের মৎস্য ক্ষেত্র।
2.জল পরিবহন এর সুবিধা:
সমুদ্র স্রোতের অনুকূলে বাণিজ্যিক জাহাজ গুলি দ্রুত গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে পারে । তাই পৃথিবীর সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ গুলি সমুদ্র স্রোতকে অনুসরণ করে গড়ে উঠেছে ।
3. বন্দরে কাজকর্মের প্রসার:
শীতপ্রধান অঞ্চলের বন্দর গুলিতে শীতকালে সমুদ্রের জল বরফ হয়ে যাওয়ায় বন্দরে সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায় । কিন্তু যেসব বন্দরের পাশ দিয়ে উষ্ণ স্রোত প্রবাহিত হয় সেগুলি বলতে পারে না। ফলে সারা বছর কাজকর্ম স্বাভাবিক থাকে । যেমন- উষ্ণ উপসাগরীয় স্রোতের প্রভাবে নরওয়ের হেমারফেস্ট বন্দর শীতকালেও বরফ মুক্ত থাকে।
4. জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি:
শীতল স্রোতের সঙ্গে ভেসে আসা হিমশৈলগুলি জাহাজ চলাচলে বিপদ সৃষ্টি করে। যেমন-1912 সালে টাইটানিক জাহাজ হিমশৈলে ধাক্কা খেয়ে ডুবে যায় । এছাড়া উষ্ণ ও শীতল স্রোতের মিলন অঞ্চলে সৃষ্ট ঘন কুয়াশা জাহাজ চলাচলে ব্যাঘাত ঘটায়।
সামুদ্রিক জীবের উপর প্রভাব:
সমুদ্রস্রোত সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। প্রবালের বংশবিস্তার, প্লাংকটন এর সমাবেশ , মাছেদের বৃদ্ধি ও বিভিন্ন সামুদ্রিক জীবের বিকাশ ও বন্টন সমুদ্রস্রোত দ্বারা বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত হয়।
সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির কারণ - Causes of Origin of Ocean Currents
সমুদ্রের বিপুল জলরাশি যখন নিয়মিতভাবে , নির্দিষ্ট দিকে, অনুভূমিক আকারে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয়, তখন সেই প্রবাহমান জলরাশিকে সমুদ্রস্রোত বলে।
সমুদ্রস্রোত সৃষ্টির কারণ গুলি হল -
1.বায়ুপ্রবাহ:
ভূপৃষ্ঠের উপর দিয়ে নিয়মিতভাবেই নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত নিয়ত বায়ুগুলি( আয়ন বায়ু, পশ্চিমা বায়ু, ও মেরু বায়ু) সমুদ্রপৃষ্ঠের জলরাশিকে নিজের প্রবাহের দিকে টেনে নিয়ে যায় এবং সমুদ্রস্রোত সৃষ্টি করে।
যেমন-
i. আয়নবায়ুপ্রবাহ অনুসারে উত্তর গোলার্ধে উত্তর পূর্ব দিক থেকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে দক্ষিণ পূর্ব দিক থেকে সমুদ্র স্রোত প্রবাহিত হয়। উদাহরণ- প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত।
ii. পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে সমুদ্র স্রোত প্রবাহিত হয়। উদাহরণ- উপসাগরীয় স্রোত।
iii. মেরু বায়ুর প্রভাবে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে সমুদ্র স্রোত প্রবাহিত হয়। উদাহরণ- ল্যাব্রাডর স্রোত , বেরিং স্রোত।
2.পৃথিবীর আবর্তন গতি:
পৃথিবীর আবর্তন গতির ফলে সৃষ্ট কোরিওলিস বল সমুদ্রস্রোতের গতির সাথে সমকোণে ক্রিয়া করে। এর ফলে ফেরেলের সূত্র অনুসারে সমুদ্রস্রোত উত্তর গোলার্ধের ডান দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধের বাম দিকে বেঁকে যায় এবং নতুন সমুদ্রস্রোতের উৎপত্তি ঘটায় ।যেমন- উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে উত্তর নিরক্ষীয় স্রোত ডানদিকে বেকে জাপান বা কুরোশিও স্রোতের সৃষ্টি হয়।
3.সমুদ্র জলের উষ্ণতা:
নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে সূর্যরশ্মি পতনকোনের তারতম্যের জন্য সমুদ্র জলের উষ্ণতা ক্রমশ কমতে থাকে। ফলে, নিরক্ষীয় অঞ্চলের উষ্ণ ও হালকা জলরাশি বহিঃ স্রোত রূপে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়।এই শূন্যতা পূরণের জন্য তখন মেরু অঞ্চলের শীতল ও ভারী জলরাশি অন্তঃস্রোতরূপে নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয় । যেমন- উপসাগরীয় উষ্ণ স্রোত নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে সুমেরুর দিকে প্রবাহিত হয়।
4.সমুদ্র জলের লবনতা:
সমুদ্রের অধিক লবণাক্ত জল ভারী হওয়ায় সমুদ্রের নিম্নাংশ দিয়ে অন্তঃ স্রোত রূপে কম লবণাক্ত হালকা জলের দিকে বয়ে যায় এবং কম লবণাক্ত জল হালকা হওয়ায় সমুদ্রের ওপরের অংশ দিয়ে বহিঃ স্রোত রূপেক অধিক লবণাক্ত জলের দিকে প্রবাহিত হয়। যেমন- আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ভূমধ্য সাগরের দিকে জলরাশির বহিঃ স্রোতের মূল কারণ লবণতার পার্থক্য।
5.সমুদ্র জলের ঘনত্ব:
উষ্ণতা, লবনতা, চাপ প্রভৃতি তারতম্যের জন্য সমুদ্র জলের ঘনত্বের তারতম্য ঘটে । নিয়মানুসারে কম ঘনত্বের জলরাশি বহিঃস্রোত রূপে অধিক ঘনত্ব অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়, আবার অধিক ঘনত্ব জলরাশি অন্তঃস্রোতরূপে কম ঘনত্ব অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয় । যেমন- পূর্ব গ্রীনল্যান্ড স্রোত অন্তঃস্রোতরূপে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়।
6.বরফের গলন:
দুই মেরু সংলগ্ন সমুদ্রে বরফ যেখানে গলে যায় সেখানে জলরাশির পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধি পায় এবং সমুদ্রে জলের লবনতা হাস পায়। উভয় কারণেই ওই জলরাশি কম লবণাক্ত ও স্বল্প জলরাশি সমন্বিত অঞ্চলের দিকে ধাবিত হয়ে সমুদ্র স্রোতের সৃষ্টি করে।
7.ঋতুপরিবর্তন:
ঋতুভেদে বায়ুপ্রবাহের দিক পরিবর্তন হয়, অধঃক্ষেপনের হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে। এর ফলে সমুদ্রস্রোতের দিক ও গতির পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যেমন- ভারত মহাসাগরে গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে মৌসুমী স্রোত উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয় এবং শীতকালে উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হয়।
8. উপকূলের আকৃতি:
সমুদ্রস্রোতের প্রবাহপথে মহাদেশীয় উপকূলভাগ বা দ্বীপ অবস্থান করলে সমুদ্রস্রোত বাধা পেয়ে বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং নতুন সমুদ্র স্রোতের সৃষ্টি হয় । যেমন- আটলান্টিক মহাসাগরে দক্ষিণ নিরক্ষীয় স্রোত ব্রাজিল উপকূলে বাধা পেয়ে ব্রাজিল স্রোত ও ক্যালিফোর্নিয়া স্রোত এর সৃষ্টি হয়েছে।
এগুলি ছাড়াও
9.মাধ্যাকর্ষণ শক্তি
10.সমুদ্রতলের ভূপ্রকৃতি
11.বাষ্পীভবন
12.বায়ুর চাপের তারতম্য
13.সামুদ্রিক শৈলশিরার উপস্থিতি প্রভৃতি কারণ সমুদ্র সৃষ্টিতে প্রভাব বিস্তার করে।
পৃথিবীর আবর্তন গতি, বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রজলের লবনতা, উষ্ণতা, ঘনত্বের তারতম্য, সমুদ্রের গভীরতার পার্থক্য, তটরেখা রেখার প্রকৃতি প্রভৃতি কারণে সমুদ্রের জলরাশি নিয়মিত, নিরবিচ্ছিন্নভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয়, একে সমুদ্রস্রোত বলে।
সমুদ্রের বিপুল জলরাশি যখন নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট দিকে আনুভূমিক আকারে একস্থান থেকে অন্যস্থানে প্রবাহিত হয়, তখন ওই প্রবহমান জলরাশিকে সমুদ্রস্রোত বলে।
বৈশিষ্ট্য:
1.সাধারণত সমুদ্রস্রোত একটি নির্দিষ্ট দিকে (একমুখী) প্রবাহিত হয়। তবে ভারত মহাসাগরে মৌসুমী স্রোত বিপরীতমুখী।
4.ফেরেলের সূত্র অনুসারে সমুদ্রস্রোত উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়।
সমুদ্রতরঙ্গ(Sea waves):
প্রবল বায়ুপ্রবাহ ও ভূমিকম্পের প্রভাবে সমুদ্রের উপরিভাগে জলরাশি একই স্থানে আবদ্ধ থেকে উলম্বভাবে কয়েক ফুট বা মিটার ওঠানামা করলে তাকে সমুদ্রতরঙ্গ বলে। অর্থাৎ এতে সমুদ্রেরজলের আনুভূমিক স্থানান্তর হয় না।
বায়ু প্রবাহের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের জলরাশি একই স্থানে অবস্থান করে পর্যায়ক্রমে নিরবিচ্ছিন্নভাবে উপরে নিচে ওঠানামা করে একে, সমুদ্র তরঙ্গ বলে।
সমুদ্রস্রোতের প্রকারভেদ(Types of ocean currents):
উষ্ণতার তারতম্যের ভিত্তিতে সমুদ্রস্রোতকে দুই ভাগে ভাগ করা যায় । যথা- উষ্ণস্রোত ও শীতলস্রোত ।
1.উষ্ণস্রোত(Warm currents) :
নিরক্ষীয় তথা ক্রান্তীয় অঞ্চলের উষ্ণ সমুদ্রের উষ্ণ ও হাল্কা জলরাশি সমুদ্রজলের উপরিভাগ দিয়ে পৃষ্ঠপ্রবাহরূপে শীতল মেরুঅঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয় , একে বলে উষ্ণস্রোত বলে।
উষ্ণ ও হালকা জলরাশি সমুদ্রজলের উপরিভাগ দিয়ে প্রবাহিত হয় বলে একে বহিঃস্রোত বলে।
যেমন- উষ্ণ উপসাগরীয় বা নিরক্ষীয় স্রোত।
2.শীতলস্রোত(Cold currents) :
উচ্চ অক্ষাংশে তথা মেরু অঞ্চলের শীতল ও ভারী জলরাশি সমুদ্রের নিচের অংশ দিয়ে অন্তঃস্রোতরূপে নিম্ন অক্ষাংশ তথা উষ্ণমন্ডলের দিকে প্রবাহিত হয়। একে শীতল স্রোত বলে।
শীতল ও ভারী জলরাশি সমুদ্র জলের নিচের অংশ দিয়ে প্রবাহিত হয় বলে, একে অন্তঃস্রোত বলে।
যেমন - ল্যাব্রাডর স্রোত ।
আটলান্টিক, প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরে কি কি শীতল ও উষ্ণ স্রোত সৃষ্টি হয় তার তালিকা ও মানচিত্র নিম্নরূপ-