Friday, October 23, 2020

নদীর ক্ষয়কার্য বা সঞ্চয় কার্য

নদীর ক্ষয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ

নদীর ক্ষয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ সমূহ প্রধানত নদীর উচ্চগতিতে পরিলক্ষিত হয় । নদীরখাতের ক্ষয় ও পরিবহন এর ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপকে ক্ষয়জাত ভূমিরূপ বলে। নিম্নে ক্ষয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপগুলি আলোচনা করা হল-

1.'V' আকৃতির উপত্যকা:
আর্দ্র ও আর্দ্রপায় জলবায়ু অঞ্চলে নদীর পার্বত্য প্রবাহের ভূমির ঢাল বেশি থাকায় নদীগুলি প্রবলভাবে নিম্ন ক্ষয় করে এবং বৃষ্টিপাতের প্রভাবে স্বল্প পরিমাণে পার্শ্ব ক্ষয় করে। ফলে নদী উপত্যকা একদিকে গভীর হয়ে ওঠে এবং পূর্বাপেক্ষা চওড়া 'V'আকৃতির উপত্যকা গঠন করে।

2.শৃঙ্খলিত বা আবদ্ধ শৈলশিরা:
কঠিন শিলাকে পরিহার করার জন্য পার্বত্য প্রবাহে নদী ছোট ছোট বাঁক নিয়ে প্রবাহিত হয়। এর ফলে পরপর দুটি বাঁকের সমস্ত স্পারগুলিকে একসঙ্গে দেখা যায় না।এই প্রকার ভূমিরূপ কে শৃঙ্খলিত শৈলশিরা বলে ।উদাহরণ: তিস্তা নদী পার্বত্য অংশে এই ভূমিরূপ দেখা যায়।

3.গিরিখাত:
উচ্চগতিতে নদীর প্রবলবেগে প্রবাহিত হওয়ায় পার্শ্বক্ষয়ের তুলনায় নিম্ন ক্ষয় অধিক হয়। এরফলে নদীখাত খাড়া V বা l আকৃতির হয় এবং নদী প্রায় সোজা পথে প্রবাহিত হয়। পার্বত্য অঞ্চলের এইরূপ গভীর ও সংকীর্ণ নদী উপত্যকাকে গিরিখাত বলে ।উদাহরণ: পৃথিবীর গভীরতম গিরিখাত নেপালের কালী নদীর উপর অবস্থিত কালীগণ্ডকী গিরিখাত (5571 মিঃ) এবং শতদ্রু, সিন্ধু নদীতে এরূপ একাধিক গিরিখাত দেখা যায়।

4.ক্যানিয়ন:
পার্বত্য অঞ্চলের গিরিখাত এর মতই সূক্ষ্ম মরু অঞ্চলে যে ইংরেজি I আকৃতির খাড়া উপত্যকা সৃষ্টি হয় তাকে ক্যানিয়ন বলে ।
উদাহরণ: আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার কলোরাডো নদীর গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন পৃথিবীর দীর্ঘতম ক্যানিয়ন (483 কিমি দীর্ঘ, সর্বাধিক গভীরতা প্রায় 1600মি)। পেরু দেশের কলকা নদীর এল ক্যানন দা কলকা পৃথিবীর গভীরতম(4375মি) ক্যানিয়ন।

5.খরস্রোত:
নদীর পার্বত্য প্রবাহে প্রচন্ড ঢাল সম্পন্ন জলপ্রপাতে যখন বিপুল পরিমাণ জলরাশি প্রবাহিত হয় তখন তাকে খরস্রোত বলে।
উদাহরণ: আফ্রিকার জাইরে নদীতে পরপর 32 টি খরস্রোতের সৃষ্টি হয়েছে।

6.জলপ্রপাত:
উচ্চগতিতে নদীর তলদেশের হঠাৎ বিচ্যুত হলে বিচ্যুতি তলের উপর থেকে জলরাশি নিচে পতিত হয়, একে জলপ্রপাত বলে। কঠিন ও কোমল শিলা পাশাপাশি অবস্থান করলে এইরূপ জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলার রিও করোনি নদীর এঞ্জেল জলপ্রপাত পৃথিবীর উচ্চতম জলপ্রপাত(উচ্চতা979 মি) । ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের ভারাহি নদীর ওপর কুঞ্চিকল জলপ্রপাত(455মি) হলো ভারতের উচ্চতম জলপ্রপাত।

7.প্রপাত কূপ:
জলপ্রপাতের পাদদেশে সৃষ্ট ঘূর্ণাবর্তের মধ্যস্থিত নুড়ি বা শিলা পাক খেতে খেতে ঘর্ষণের ফলে ভূমি শিলায় যে গর্তের সৃষ্টি করে তাকে প্রপাতকূপ বলে।

8.মন্থকূপ:
প্রবল বেগে প্রবাহিত নদীর তলদেশ বা পার্শ্ব দেশে জলাবতের সৃষ্টি হলে সেখানে নুরি বা শিলার  ঘর্ষণের ফলে যে গর্তের সৃষ্টি হয়, তাকে মন্থকূপ বলে। 

নদীর সঞ্চয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ

ভূমির ঢাল কমে গেলে নদীর মধ্যগতি নিম্নগতি তে নদীবাহিত পলি বালিগাদা নোবিপ্রবি সঞ্চিত হয়ে বিভিন্ন প্রকার সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ গড়ে তোলে

1.পলোল ব্যজনী:
পার্বত্য প্রবাহ থেকে যখন নদী সমভূমিতে পতিত হয় তখন নদীর বহন ক্ষমতা হঠাৎ হ্রাস পাওয়ায় নদীবাহিত পলি, বালি, নুড়ি প্রভৃতি পর্বতের পাদদেশে শঙ্কুর মত জমা হয়। একে বলে পলল শঙ্কু। পাশাপাশি কয়েকটি পলল শঙ্কুর মিলিত হয়ে পলিমঞ্্চ্চচ গঠন করে। যখন সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয় তখন তাকে পলোল শঙ্কুর আকৃতি হয় একে একই পলোল ব্যজনী বা পলল পাখা বলে এর উচ্চতা কল শংকর অপেক্ষা কম হয় যে নদীর জলপ্রবাহ বেশি কিন্তু পরিমাণ কম সেই নদীতে সৃষ্টি হয় উদাহরণ হিমালয় আন্দিজ রকি ইত্যাদি পর্বতের পাদদেশে নদীতে পলোল ব্যজনী সৃষ্টি হয়েছে

2.নদী বাঁক বা মিয়েন্ডার:
মধ্য ও নিম্নপ্রবাহে নদীর গতিবেগ কম থাকায় সামান্য বাধার সম্মুখীন হলে নদীর গতিপথের পরিবর্তন ঘটায় এবং এঁকে বেঁকে প্রবাহিত হয়, একে নদী বাঁক বলে ।
তুরস্কের আঁকাবাঁকা নদী মিয়েন্ডারেস নাম অনুসারে এই ভূমিরূপ এর নাম হয়েছে মিয়েন্ডার। সমভূমি অঞ্চলেে নদীর গতিপথে পলোল অবক্ষেপণ এর ফলে নদীর গতি ধীর হয়ে যায় এবং নদীপথ বেঁকে যায়। নদীর বিকেে যাওয়া অংশে অতিরিক্ত ক্ষয়়় এর ফলে খাড়া পাড়ের সৃষ্টি হয় ।খাড়া পাড়ের বিপরীত দিকে নদী  স্রোতের বেগ কম থাকায়়় সঞ্চয় কার্য ঘটতে থাকে। ফলে সেখাানে ঢালু পাড়ের  সৃষ্টিি হয় । উদাহরণ- গঙ্গা নদীতে এবং নদীয়া জেলার জলঙ্গি নদীতে অসংখ্য নদীবাঁক দেখা যায়। 

3.অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ
 নিম্নপ্রবাহে আঁকাবাঁকা পথে প্রবাহিত নদী বাঁক -এর বাইরের পাড়টি ক্ষয়প্রাপ্ত হয় ও বাঁকের অভ্যন্তরীণ পাড়টিতে পলি সঞ্চিত হয়়। এর ফলে নদীর বাঁক আরোও বাড়তে থাকে এবং একসময় দুটি বাঁক পৃথককারী বাঁকের গ্রীবা অংশটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ঘোড়ার ক্ষষুরের মত একটি অংশ নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ও মূল নদীটি  সোজাপথে প্রবাহিত হয়। এই প্রকার ঘোড়ার খুরের মত বিচ্ছিন্ন অবরুদ্ধ হদকে  অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ বলে। এই ভূমিরূপটি মূলত নদীর ক্ষয়, বহন ও অবক্ষেপণ এর মিলিত কাজের ফলে সৃষ্টি হয়। উদাহরণ-গঙ্গা নদীর নিম্ন প্রবাহ দেখা যায়। 

4.প্লাবনভূমি:
সমভূমি প্রবাহের সময় নদীখাতের গভীরতা হ্রাস পায়।এই সময় নদীর জল হঠাৎ বৃদ্ধি পেলে (অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে) অতিরিক্ত জল নদীরখাত ছাপিয়ে পার্শ্ববর্তী উপত্যাকা অঞ্চলকে প্লাবিত করে এবং নদীবাহিত পলি, বালি, কাদা পার্শ্ববর্তী এলাকায় জমা হয়ে সমভূমির সৃষ্টি হয়, একে প্লাবনভূমি বলে। উদাহরণ- গঙ্গাা, সিন্ধু প্রভৃতি নদীর সমভূমি প্রবাহে প্লাবনভূমি দেখা যায়়। 

5.স্বাভাবিক বাঁধ:
নদীতে প্লাবন হওয়ার সময় নদীখাতের ঠিক পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে সর্বাধিক পরিমাণে পলি জমা হয়। এইভাবে একাধিকবার পলি জমা হতে হতে নদী এবং প্লাবনভূমির মধ্যবর্তী অঞ্চলে একটু বেশি উচ্চতাসম্পন্ন ভূমির সৃষ্টি হয়, একে স্বাভাবিক বাঁধ বলে। 
স্বাভাবিক বাঁধ এর নদীর দিকে ঢাল খাড়া এবং প্লাবনভূমির দিকটি ক্রমশ ঢালু হয়। স্বাভাবিক বাঁধ এর গড় উচ্চতা 2 থেকে 3 মিটার হয়। কিন্তু পো, হোয়াংহো নদীতে 7 থেকে 10 মিটার পর্যন্ত স্বাভাবিক বাঁধ এর উচ্চতা দেখা যায়। মিশরে নীলনদের গতিপথে একাধিক স্বাভাবিক দেখা যায়। 

6.খাঁড়ি:
মোহনার কাছে নদীর স্রোত বেশি হলে অথবা জোয়ার ভাটার প্রকোপ অধিক থাকলে নদীবাহিত পলি, কাদা, বালি প্রভৃতি সঞ্চিত হতে পারে না। এর ফলে নদীর মোহনা যথেষ্ট খোলা ও চওড়া হয়। একে খাঁড়ি বা ফাথ বলা হয়। বর্তমানে সুন্দরবন অঞ্চলের অধিকাংশ নদীগুলি খাঁড়ির অন্তর্গত। উদাহরণ- রাশিয়ার উত্তরাংশে অবস্থিত ওব নদীর মোহনায় অবস্থিত খাঁড়িটি হল পৃথিবীর দীর্ঘতম খাঁড়ি। এর দৈর্ঘ্য প্রায় 885 কিমি এবং এটি প্রায় 80 কিমি চওড়া। 

7.বদ্বীপ:
নদীর মোহনা সংলগ্ন অংশে নদীবাহিত পলি, বালি,কাদা প্রভৃতি সঞ্চিত হয়ে মাত্রাহীন 'ব' কিংবা গ্রিক অক্ষর ডেল্টার ন্যায় অবস্থান করলে, তাকে বদ্বীপ বলে।
     যখন একটি নদী কোনো স্থির জলাশয়ে পতিত হয়ে সেখানে নুড়ি, পলি, বালি, কাদায় সঞ্চয় করে, তাকে বদ্বীপ বলে। 
বদ্বীপ বিভিন্ন প্রকারের হয়। যেমন- ত্রিকোণাকার বদ্বীপ, ধনুকাকৃতি ব-দ্বীপ, পাখির পায়ের আকৃতিবিশিষ্ট বদ্বীপ, হদ বদ্বীপ, সমুদ্র বদ্বীপ প্রভৃতি। উদাহরণ - গঙ্গা-ব্রহ্মপুএ -এর বদ্বীপ পৃথিবীর মধ্যে বৃহত্তম। এছাড়াও হুগলি নদীর মোহনায় সাগরদ্বীপ অন্যতম। 

Thursday, September 10, 2020

নদী-River

নদী(River):
যে  স্বাভাবিক জলধারা তুষারগলা জল বা বৃষ্টির জলে পুষ্ট হয়ে বা প্রস্রবণ থেকে উৎপন্ন হয়ে ভূমির ঢাল অনুসারে প্রবাহিত হয় সাগর, হ্রদ বা অন্য জলধারার সঙ্গে মিলিত হয় তাকে নদী বলে। 
নদী অববাহিকা(River Basin):
কোন সুবিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রধান নদী, শাখানদী, উপনদী, প্রশাখা নদী যে অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, তাকে নদী অববাহিকা বলে। 
জলবিভাজিকা(Interfluves):
যে উচ্চভূমি পাশাপাশি অবস্থিত দুই বা ততোধিক নদী অববাহিকাকে পৃথক করে, তাকে বলে জলবিভাজিকা।হিমালয়, বিন্ধ্্য , সাতপুরা হলো ভারতের গুরুত্বপূর্ণ জলবিভাজিকা। 

নদীর বিভিন্ন গতি:
ভূমির ঢাল, জলের পরিমাণ এবং প্রবাহের বিভিন্নতা অনুযায়ী নদীর গতিপথ বা প্রবাহকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- 
1.উচ্চগতি বা পার্বত্য প্রবাহ
2.মধ্যবর্তী বা সমভূমি প্রবাহ 
3.নিম্নগতি বা  বদ্বীপ প্রবাহ

1.উচ্চগতি বা পার্বত্য প্রবাহ:
উৎস থেকে নদী যতদূর পর্যন্ত পার্বত্য অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, তাকে নদীর উচ্চগতির বা পার্বত্য প্রবাহ বলে। 
যেমন- গোমুখ থেকে হরিদ্দার পর্যন্ত গঙ্গার উচ্চগতি বা পার্বত্য প্রবাহ দেখা যায়। 
বৈশিষ্ট্য:
1.উচ্চগতিতে ভূমির ঢাল বেশি থাকে বলে নদী পার্শ্বক্ষয় অপেক্ষা  নিম্নক্ষয় বা নদীর তলদেশে ক্ষয় হয় বেশি হয়। 2.উচ্চগতিতে নদীতে বোঝা কম থাকে এবং নদী ক্ষয়িত পদার্থ বহনও করে। 
3.উচ্চগতিতে নদীর গুলি খরস্রোতা হয় বলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে সহায়ক হলেও নৌ-পরিবহনের পক্ষে অনুপযুক্ত। 
সৃষ্ট ভূমিরূপ:
এই গতিতে নদী 'I' ও 'V' আকৃতির উপত্যকা, জলপ্রপাত, গিরিখাত, মন্থকূপ প্রভৃতি ভূমিরূপ সৃষ্টি করে। 
2.মধ্যবর্তী বা সমভূমি প্রবাহ:
উচ্চগতির পরবর্তী ক্ষেত্রে নদী যখন সমভূমিতে নেমে আসে তখন ঢালের পরিবর্তনের কারণে নদীর গতিবেগ কমে যায়, নদীর এই গতিপ্রবাহকে মধ্যগতি বা সমভূমি প্রবাহ বলে। 
যেমন- হরিদ্দার থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান পর্যন্ত গঙ্গানদীর মধ্যগতি বা সমভূমি প্রবাহ। এই প্রবাহপথ হল 900 কিমি। 
বৈশিষ্ট্য:
1.নদী সমভূমিতে নেমে আসে বলে ভূমির ঢাল হঠাৎ করে অনেকটা কমে যায়, ফলে নদীর গতিবেগ হ্রাস পায়। 
2.এই সময় নদী নিম্নক্ষয় অপেক্ষা পার্শ্বক্ষয় বেশি করে, তবে এই গতিতে নদীর প্রধান কাজ বহন। 
3.মধ্যগতিতে প্রধান নদীতে অনেক উপনদী এসে মিলিত হয় বলে জলের পরিমাণ ও নদীবাহিত বোঝার পরিমাণ দুই-ই বৃদ্ধি পায়। 
4.নদী এই সময় জলসেচ ও নৌপরিবহনে সাহায্য করে থাকে। 
সৃষ্ট ভূমিরূপ:
এই গতিতে নদী মিয়েন্ডার, বালুচর, অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ, চওড়া ও অগভীর নদী উপত্যকা প্রভৃতি ভূমিরূপ সৃষ্টি করে। 
3.নিম্নগতি বা  বদ্বীপ প্রবাহ:
মধ্যগতির পরবর্তীতে নদী যখন সমভূমির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে ক্ষয়ের নিম্নসীমার কাছে চলে আসে এবং গতিবেগ ক্রমশ মন্থর হয়, নদীর সেই প্রবাহকে নিম্নগতি বা বদ্বীপ প্রবাহ বলে। 
যেমন- মুর্শিদাবাদ থেকে মোহনা পর্যন্ত প্রায় 250 কিমি গঙ্গা নদীর নিম্ন গতি বা বদ্বীপ প্রবাহ। 
বৈশিষ্ট্য:
1.এ পর্যায়ে ভূমির ঢাল প্রায়ই থাকে না বলে নদী খুবই ধীর গতিসম্পন্ন হয়। 
2.নদী এই সময় শুধু বহন করে, তবে বোঝার পরিমাণ খুব বেশি থাকে বলে প্রধান কাজ সঞ্চয় বা অবক্ষেপণ। 
3.নদী সূক্ষ্ম পলি, বালি, কাদা সঞ্চয় করে নদী মধ্যস্থ চড়া বা বদ্বীপ গঠন করে। 
4.নদীখাত খুবই অগভীর ও চওড়া হয়। 
5.নদী এই সময় জলসেচ ও নৌপরিবহনে সহায়ক হয়। 
সৃষ্ট ভূমিরূপ:
নিম্নগতিতে সঞ্চয়ের মাধ্যমে নদী বিস্তৃত প্লাবনভূমি, স্বাভাবিক বাঁধ, অসংখ্য বদ্বীপ প্রভৃতি গড়ে তোলে। 

নদীর উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত তার দীর্ঘ গতিপথে বিভিন্ন ধরনের কাজ করে। নদীর কাজ প্রধানত তিন ধরনের, যথা- ক্ষয়, বহন ও অবক্ষেপণ। নদীর এই কাজগুলি নির্ভর করে নদীর শক্তির ওপর, যা নির্ভর করে নদীর জলের আয়তন ও পরিমাণ, গতিপথের ঢাল, জলপ্রবাহের গতি এবং বাহিত বস্তুভরের উপর। এইসব অবস্থান নদীর গতিবেগ এর তারতম্য ঘটায় এবং বিভিন্ন কাজকে প্রভাবিত করে। 

নদীর জলপ্রবাহ পরিমাপের একক হল- কিউসেক বা কিউমেক। কিউসেক হলো কিউবিক ফুট/সেকেন্ড এবং কিউমেক হলো কিউবিক মিটার/সেকেন্ড। 

নদীখাতের ক্ষয় ও পরিবহনের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপকে ক্ষয়জাত ভূমিরূপ বলে। নদীর ক্ষয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ সমূহ প্রধানত নদীর উচ্চ গতিতে পরিলক্ষিত হয়। 
যেমন- Vআকৃতির উপত্যকা, গিরিখাত, ক্যানিয়ন, জলপ্রপাত ইত্যাদি। 
ভূমির ঢাল কমে গেলে নদীর মধ্যগতি ও নিম্নগতিতে নদীবাহিত পলি, কাদা, নূরী  প্রভৃতি সঞ্চিত হয়ে বিভিন্ন প্রকার সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ গড়ে তোলে একে সঞ্চয়জাত ভূমিরূপ বলে। 
যেমন- মিয়েন্ডার, পলল ব্যজনী, অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ, বদ্বীপ ইত্যাদি। 

Saturday, September 5, 2020

বায়ুমণ্ডল

আমরা যেখানে বাস করি সেই পৃথিবীপৃষ্ঠের ওপরে বেষ্টন করে থাকা আবরণী হল বায়ুমণ্ডল, যা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে পৃথিবীর গায়ে চাদরের মতো জড়িয়ে থাকে। পৃথিবীতে জীবের বেঁচে থাকার জন্য যেমন বায়ুমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ তেমনি বায়ুমণ্ডলসহ পৃথিবীর জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষার্থে অন্যান্য উপাদান গুলির সঠিক মাত্রা থাকাও বাঞ্ছনীয়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি কর্তা নিয়ম অনুসারে গ্যাসীয় উপাদানগুলি তাদের ধর্ম অনুযায়ী এক একটি স্তরে সজ্জিত আছে। আর আবহমানকাল ধরে মহাকাশে বিজ্ঞানীরা সেই সৃষ্টিকর্তার রহস্যে মোড়া বায়ুমণ্ডলের স্তর নিয়ে চিরন্তন গবেষণা করে চলছেন। 

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উপরের দিকে প্রায় 10,000 কিমি পর্যন্ত যে অদৃশ্য গ্যাসীয় আবরণ পৃথিবীকে বেষ্টন করে আছে তা হলো বায়ুমন্ডল। এই অদৃশ্য গ্যাসীয় আবরণ পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে জড়িয়ে থাকে এবং পৃথিবীর সঙ্গে আবর্তন করে। 
  পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় 10,000 কিমি পর্যন্ত উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত যে অদৃশ্য গ্যাসীয় আবরণ পৃথিবীতে বেষ্টন করে আছে, তাকে বায়ুমণ্ডল বলা হয়। অর্থাৎ পৃথিবী কে বেষ্টনকারী অদৃশ্য গ্যাসীয় আবরণ হল বায়ুমণ্ডল। 

বায়ুমণ্ডল গঠনকারী প্রধান উপাদান গুলি হল-
 1.গ্যাসীয় উপাদান 
2.জলীয়বাষ্প এবং
 3.ধূলিকণা
বায়ুমন্ডলে এই সকল উপাদান এর শতকরা 97 ভাগ পদার্থই সমুদ্রপৃষ্ঠতল থেকে 27 থেকে 30 কিমি মধ্যে অবস্থান করে। 



1.গ্যাসীয় উপাদান:
বায়ুমন্ডলে বিভিন্ন গ্যাসের উপাদান এর মধ্যে প্রধান হল নাইট্রোজেন(2), অক্সিজেন(2) অর্থাৎ, বায়ুমন্ডলের গ্যাসীয় উপাদান এর প্রায় 99 শতাংশ নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন নিয়ে গঠিত। অন্যান্য গ্যাসগুলির মধ্যে আছে আর্গন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, হিলিয়াম, হাইড্রোজেন, ওজোন, নিয়ন, ক্রিপটন, জেননমিথে, মিথেন প্রভৃতি। 

2.জলীয় বাষ্প:
জলের গ্যাসীয় অবস্থাকেই জলীয়বাষ্প বলে।বায়ুমন্ডলের সব স্থানে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ একই থাকে না। উচ্চতা, অক্ষাংশ, উষ্ণতা, স্থলভাগ, ও জলভাগের বন্টন এর তারতম্যের জলীয় বাষ্পের উপস্থিতির তারতম্য ঘটে। মেঘাচ্ছন্নতা, বৃষ্টিপাত, শিশির, তুষারপাত, ঝড় প্রভৃতি দুর্যোগ জলীয়বাষ্পের উপস্থিতির জন্যই সৃষ্টি হয়। 

3.ধূলিকণা:
বায়ুমণ্ডলের আরে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ধূলিকণা যা অ্যারোসল নামে পরিচিত। সমুদ্রতীর অথবা মরু অঞ্চলের সূক্ষ্ম বালিকণা, কলকারখানাযর পোড়া কয়লার ছাই, বিভিন্ন প্রকার অতি সূক্ষ্ম খনিজ লবণ, আগ্নেয়গিরি থেকে উৎক্ষিপ্ত ছাইভস্ম, উল্কার ধ্বংসাবশেষ  প্রভৃতি ধূলিকণা রূপে বায়ুমন্ডলে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। 

উপাদান ও উষ্ণতার ভিত্তিতে বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস:
উপাদানগত তারতম্যের ভিত্তিতে বায়ুমন্ডলকে দুটি'ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-
1.সমমন্ডল ও 2.বিষমমন্ডল
1.সমমন্ডল(Homosphere) :
সমুদ্র সমতল থেকে ঊর্ধ্বে 100 কিমি( মতান্তরে 80-90 কিমি) উচ্চতা পর্যন্ত অংশে বায়ুমণ্ডল গঠনকারী উপাদানগুলির অনুপাত মোটামুটি একই রকম থাকে, তাই এই স্তর সমমন্ডল(Homosphere) নামে পরিচিত। বিশেষত বিভিন্ন প্রকার গ্যাস, জলীয়বাষ্প এবং জৈব ও অজৈব কণিকা দ্বারা এই স্তরটি গঠিত। এই অঞ্চলের প্রকৃতিই পৃথিবীর জলবায়ু নির্ধারণ করে। 
2.বিষমমন্ডল(Heterosphere):
হোমোস্ফিয়ার বা সম মন্ডলের ঊর্ধ্বে প্রায় 100 কিলোমিটার থেকে 10000 কিলোমিটার পর্যন্ত অংশে বায়ুমণ্ডল গঠনকারী উপাদানগুলির অনুপাত একই রকম থাকে না এবং বিভিন্ন গ্যাসের স্তরগুলির মধ্যে বিভিন্নতা দেখা যায়। তাই এই স্তর বিষমমন্ডল(Heterosphere) নামেে পরিচিত।  বিশেষত  এই স্তরটিতে আণবিক ওজন অনুসারে প্রথমে ভারী গ্যাস এবং ধীরে ধীরে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হালকা গ্যাস অবস্থান করে। এই অঞ্চল চারটি স্তরে বিভক্ত। যথা-
1.আণবিক নাইট্রোজেন স্তর (100-200 কিমি) 
2.পরমানবিক অক্সিজেন স্তর(201-1000 কিমি) 
3. হিলিয়াম স্তর (1001-2000 কিমি) 
4. হাইড্রোজেন স্তর (3500-10000 কিমি) 


উষ্ণতার ভিত্তিতে বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস:
উষ্ণতার তারতম্যের ভিত্তিতে বায়ুমন্ডলকে 6 টি ভাগে ভাগ করা যায়। 
1.ট্রপোস্ফিয়ার 
2.স্ট্রাটোস্ফিয়ার 
3.মেসোস্ফিয়ার 
4.আয়নোস্ফিয়ার 
5.এক্সোস্ফিয়ার 
6.ম্যাগনেটোস্ফিয়ার

1.ট্রপোস্ফিয়ার:
এটি বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে নীচের ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন স্তর যেখানে বায়ুমণ্ডলের যাবতীয় পরিবর্তন দেখা যায়। 
বিস্তার:
এই স্তর নিরক্ষীয় অঞ্চলে 18 কিমি, ক্রান্তীয় অঞ্চলে 12.5 কিমি এবং মেরু অঞ্চলে প্রায় 8 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। 
বৈশিষ্ট্য:
1.এই স্তরে প্রতি 1000 মিটার উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে 6.4°C হারে উষ্ণতা হ্রাস পায়, একে স্বাভাবিক উষ্ণতা হ্রাস হার ( Normal Lapse Rate) বলে।
2.বায়ুমণ্ডলের 75 শতাংশ গ্যাসীয় উপাদান(N2, O2, CO2) এই স্তরে অবস্থিত।
 3.বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ (বজ্র, বিদ্যুৎ, ঝড়, বৃষ্টি) এই স্তরে দেখা  যায় , তাই একে ক্ষুব্ধমন্ডল বলা হয় । ট্রপোস্ফিয়ার উর্ধ্বসীমাকে ট্রপোপজ বলা হয় ।(ট্রপোস্ফিয়ার ও স্ট্রাটোস্ফিয়ার এর মধ্যবর্তী সংযোগকারী স্তর হল ট্রপোপজ)

2.স্ট্রাটোস্ফিয়ার:
ট্রপোস্ফিয়ারের উর্ধ্বসীমা ট্রপোপজের ওপরে বায়ুমণ্ডলের স্তর স্ট্রাটোস্ফিয়ার নামে পরিচিত। 
বিস্তার: 
ট্রপোপজ এর ওপর থেকে অর্থাৎ প্রায় 20 কিমি থেকে 50 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। 
বৈশিষ্ট্য:
1. এই স্তরে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং এর সর্বোচ্চ উচ্চতায় (50 কিমি) তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে 0°C  পৌছায়। 
2. স্তরটিতে জলীয় বাষ্প ও মেঘ না থাকায় কোনো প্রকার বায়বীয় গোলযোগ ঘটে না অর্থাৎ আবহাওয়া শান্ত থাকে তাই একে শান্তমন্ডল বলা হয়। 
3.এই স্তরে 20 থেকে 35 কিমি উচ্চতায় ওজোন(3) গ্যাসের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়, তাই এই অংশকে ওজনোস্ফিয়ার বলে। এই গ্যাস ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে উত্তপ্ত হয় বলেই এই অংশের উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়।
4.এই স্তরের উর্ধ্বসীমাকে অর্থাৎ স্ট্রাটোস্ফিয়ার ও মেসোস্ফিয়ার এর মধ্যবর্তী সংযোগকারী সীমানাকে  স্ট্যাটোপজ বলে। 

3.মেসোস্ফিয়ার:
স্ট্যাটোপজের ওপরে স্তরটিকে মেসোস্ফিয়ার বলা হয় । বিস্তার:
স্ট্যাটোপজের ওপর থেকে প্রায় 80 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত। বৈশিষ্ট্য:
1.উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই স্তরে উষ্ণতা অতি দ্রুত হারে কমতে থাকে।
2.মেসোস্ফিয়ার এর বায়ুচাপ খুবই কম । 
3.উল্কাপিণ্ড সমূহ এই স্তরে এসে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। 4.এই স্তরের উর্ধ্বসীমাকে অর্থাৎ মেসোস্ফিয়ার ও আয়নোস্ফিয়ার এর মধ্যবর্তী সংযোগকারী সীমানাকে মেসোপজ বলে। 

4.আয়োনোস্ফিয়ার:
মেসোপজের ঊর্ধ্বে বায়ুমণ্ডলের চতুর্থ স্তরটিকে আয়নোস্ফিয়ার বলে। 
বিস্তার:
মেসোপোজের উর্ধে অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠের 80 কিমি উচ্চতা থেকে 500 কিমি উচ্চতার মধ্যবর্তী অংশে এই স্তরটি অবস্থিত । 
বৈশিষ্ট্য:
1.এই স্তরে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণতা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং অতিবেগুনী ও  X-রশ্মি শোষিত হওয়ার কারণে সর্বোচ্চ অংশের উষ্ণতা প্রায় 1200° C পৌঁছায়।2. এই স্তরে  বস্তুকণা আয়নিত অবস্থায় থাকে বলে বেতার তরঙ্গ এখান থেকে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসে। 
3. এই স্তরের নিম্নাংশের বায়োবীয় উপাদানগুলি সূর্য রশ্মির তেজস্ক্রিয় ক্ষুদ্র তরঙ্গ দ্বারা ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আয়নে ভেঙে যায়। তাই একে আয়নোস্ফিয়ার বলে। 

5.এক্সোস্ফিয়ার:
আয়োনোস্ফিয়ার বা থার্মোস্ফিয়ার এর ওপরের স্তরটিকে এক্সোস্ফিয়ার বলা হয়। 
বিস্তার:
এই স্তর থার্মোস্ফিয়ার এর ওপরে অর্থাৎ 500 থেকে 750 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। 
বৈশিষ্ট্য:
1.এই স্তরে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়
 (1200°- 1600°C)
2. এই স্তরে  হিলিয়াম ও হাইড্রোজেন গ্যাসের প্রাধান্য দেখা যায়। 

6.ম্যাগনেটোস্ফিয়ার:
এক্সোস্ফিয়ারের ঊর্ধ্বে বায়ুমণ্ডলের সর্বোচ্চ স্তর তথা শেষ সীমাকে ম্যাগনেটোস্ফিয়ার বলা হয়। 
বিস্তার:
এই স্তরটি এক্সোস্ফিয়ার এর ঊর্ধ্বে অর্থাৎ 750 কিমি থেকে প্রায় 10,000 কিমি উচ্চতা পর্যন্ত বিস্তৃত। 
বৈশিষ্ট্য:
1.এই স্তরে সমস্ত বায়োবীয় উপাদান আয়নিত অবস্থায় থাকে এবং এখানকার উষ্ণতা প্রায় 2000°C । 
2. এই স্তরে প্রোটন ও ইলেকট্রন এর সমন্বয়ে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে, তাই একে ম্যাগনেটোস্ফিয়ার বলা হয়। 

Sunday, August 30, 2020

মহীসঞ্চরণ মতবাদ- Continental Drift

মহীসঞ্চরণ তত্ত্ব
পৃথিবীর মহাদেশ ও মহাসাগরগুলোর আপেক্ষিক অবস্থান আপাততভাবে স্থির এবং বর্তমান অবস্থা মনে হলেও অতি প্রাচীনকালে এগুলো এমন অবস্থানে ছিল না, তেমনি অদূর ভবিষ্যতে এগুলোর বর্তমান অবস্থানগত অবস্থান থাকবে না। এগুলোর অবস্থান পরিবর্তনশীল। ভূত্বকইয় অবস্থা, জীবাশ্মগত প্রমাণ, জলবায়ুগত প্রমাণ প্রভৃতি থেকে বোঝা যায় যে, মহাদেশ ও মহাসাগর এর অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে। এ থেকেই মহাদেশীয় সঞ্চারণ ধারণার উদ্ভব ঘটে। 




মহাদেশ গুলির অবস্থানগত পরিবর্তন সম্পর্কে সর্বপ্রথম চিন্তাভাবনা করেছিলেন ফরাসি বিজ্ঞানী স্নাইডার এবং মার্কিন বিজ্ঞানী টেলর। পরবর্তীকালে এদের চিন্তা ভাবনা সার্থকভাবে যুক্তি সহকারে প্রকাশ করেছিলেন জার্মান আবহবিদ আলফ্রেড ওয়েগনার তার গবেষণার মাধ্যমে। 1912 খ্রিস্টাব্দে আলফ্রেড ওয়েগনার এই মতবাদের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেন। 

মহীসঞ্চরণ মতবাদের মূলকথা:
1.পৃথিবী সিলিকা, অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, নিকেল ও লোহার দ্বারা গঠিত। 
2.লঘু ঘনত্বের সিয়াল স্তর মহাদেশ গঠন করছে এবং মহাদেশগুলি সিমা স্তরের উপর ভাসছে। 
3.গুরু ঘনত্বের সীমা মহাসাগরের তলদেশ গঠন করছে। 4.আজ থেকে প্রায় 34 কোটি বছর পূর্বে কার্বনিফেরাস উপযুগে সমস্ত মহাদেশগুলি একত্রিত হয়ে একটি বৃহৎ আয়তন গঠন করেছিল। যার নাম প্যানজিয়া। 
4.প্যানজিয়া কে ঘিরে রেখেছিল একটি বৃহৎ আয়তন মহাসাগর যা পৃথিবীর সমস্ত সাগর একত্রিত হয়ে গঠিত গড়ে উঠেছিল। যার নাম প্যানথালাসা। 
5.মেসোজোয়িক যুগ এর শুরু থেকে অর্থাৎ 22 কোটি বছর পূর্বেই প্যানজিয়া ভেঙে টুকরো হয়ে যায় এবং বিভিন্ন দিকে পরস্পর থেকে দূরে সরে যায়। 

মহীসঞ্চরণের কারণ:
মহাদেশীয় সঞ্চারণ কতগুলি কারণে সংঘটিত হয় এগুলি হল-
1.প্রবল জোয়ার ভাটার টান:
মূলত চন্দ্র-সূর্যের প্রবল আকর্ষণে পৃথিবীপৃষ্ঠে প্রবল জোয়ারের সৃষ্টি হয়। এই প্রবল জোয়ারি বলের প্রভাবে প্যানজিয়া বহুধাবিভক্ত হয়েছে। এই কারণে মহাদেশের পশ্চিমে সঞ্চরণ ঘটেছে।
যেমন- আমেরিকার পশ্চিমে সঞ্চরণ। 
2.বৈষম্যমূলক অভিকর্ষজ বল:
এতে বলা হয়, সিয়াল অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার এর তরলে ভাসমান অবস্থায় আছে। এতে সিয়ালের তার কেন্দ্রগামী বল অপসারিত তরলের প্লাবতা কেন্দ্রগামী বল ওই বিন্দু দুটির মধ্য দিয়ে প্রসারিত অনুভূমিক রেখার লম্বদিকে কাজ করে। ওই সমান অথচ  বিপরীতমুখী বল একই রেখা বরাবর কাজ না করার ফলে ভাসমান মহাদেশ বহুধাবিভক্ত হয়। 

মহীসঞ্চরণের ফলাফল:
আজ থেকে প্রায় 22 কোটি বছর আগে প্যানজিয়া নামে বিশাল মহাদেশটি ভাঙতে শুরু করে, ফলে বিভিন্ন মহাদেশ, মহাসাগর ও পর্বতমালা সৃষ্টি হয়। 
লরেসিয়া সৃষ্টি:
প্যানজিয়া উত্তর-দক্ষিণ দুটি বিশাল ভূখণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়। উত্তর অংশের নাম লরেসিয়া বা আঙ্গারল্যান্ড। পরে লরেশিয়া ভেঙে এশিয়া,  ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা মহাদেশের সৃষ্টি হয়। 
গন্ডোয়ানাল্যান্ড সৃষ্টি:
প্যানজিয়া দক্ষিণ অংশের নাম গন্ডোয়ানাল্যান্ড ।পরবর্তীকালে গন্ডোয়ানাল্যান্ড ভেঙে আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, ভারতীয় উপদ্বীপ এবং আন্টার্টিকা মহাদেশের সৃষ্টি হয়েছে। 

এছাড়াও বিভিন্ন পর্বতের যেমন হিমালয়, অল্পস, রকি , আন্দিজ এবং বিভিন্ন মহাসাগরের যেমন ভারত মহাসাগর প্রশান্ত মহাসাগর আটলান্টিক মহাসাগর প্রভৃতি সৃষ্টি হয়েছে। 

মহীসঞ্চরণের স্বপক্ষে যুক্তি:
ওয়েগনার তার মহীসঞ্চরণ তত্ত্বের স্বপক্ষে কতকগুলি প্রমাণ উল্লেখ করেন। 
1.জিগ-স-ফিট:
ওয়েগনারের মতে একটি ছিন্ন ছবির টুকরোগুলোকে যেমন পাশাপাশি জোড়া লাগিয়ে সম্পূর্ণ ছবি গড়ে তোলা যায়, তেমনি আটলান্টিক মহাসাগরের দুপাশে মহাদেশগুলোকে জোড়া লাগিয়ে একটি বিশাল ভূভাগ তৈরি হয়। এই পরস্পর খাঁজে খাঁজে জোড়া লাগানো বিষয়টিকে জিগ-স-ফিট বলে অভিহিত করেন। এর সাহায্যে  তিনি প্রমাণ করেন মহাদেশগুলি পূর্বে একত্রে ছিল এবং মহীসঞ্চরণ এর ফলে মহাদেশ গুলি বিচ্ছিন্ন হয়ে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছায়। 
2.হিমবাহ গঠিত ভূমিরূপ এর সাদৃশ্য:
ওয়েগনারের মতে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া কার্বনিফেরাস যুগ থেকে পার্মিয়ান যুগ পর্যন্ত একসঙ্গে পরপর জুরে একটি সুবিস্তৃত মহাদেশ তৈরি করেছিল। ফলে সমগ্র ভূখণ্ডটিতে একই ধরনের মহাদেশীয় হিমবাহ গঠিত ভূমিরূপ লক্ষ্য করা যায়। 
3.ভাঁজের সাদৃশ্য: 
আটলান্টিক মহাসাগরের দুদিকে অবস্থিত ইউরোপ মহাদেশ ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অবস্থিত গ্রীনল্যান্ডের একই ধরনের ক্যালিডোনিয়ান ও হারসিনিয়ার যুগে পর্ব্বত গঠনকারী ভাঁজের সাদৃশ্য এই মহাদেশ দুটি একদা একত্রে অবস্থান এর প্রমাণ দেয়। 
4.জলবায়ুগত প্রমাণ:
পার্মিয়ান কার্বনিফেরাস যুগ এর কয়লা স্তর এবং পাললিক শিলা স্তর এর সাথে লবণ স্তরের উপস্থিতি প্রমাণ করে উত্তর আমেরিকা প্রথমে নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূক্ষ্ম মরুভূমির এবং শেষে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে অবস্থান করছে। 
5.প্রাণী গত প্রমাণ:
 I. দক্ষিণ আমেরিকার চিলিতে এবং অস্ট্রেলিয়ার ক্যাঙ্গারু পাওয়া যায় এছাড়া দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের প্রাণী জীবাশ্ম পাওয়া যায় যা প্রমাণ করে একত্রে অবস্থান করে। 
Ii. জলহস্তী কেবল আফ্রিকা ও মাদাগাস্কারে পাওয়া যায় এই দুই স্থলভাগের মধ্যে দূরত্ব 250 কিনে তাই জলহস্তীর মত প্রাণীর পক্ষে এই দূরত্ব সাঁতার কাটা অসম্ভব অর্থাৎ এই ঘটনা ওয়েগনারের প্যান জিয়ার অস্তিত্বকে সমর্থন করে। 
Iii. সুমেরু অঞ্চলে ডায়নোসরের পায়ের ছাপ পাওয়া যায় এলাকার প্রাণী তৃণভোজী সুমেরু অবস্থান পরিবর্তন কালে জলবায়ু পরিবর্তন ঘটেছে ফলে গাছপালা ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছে ফলে এই বিশাল আকৃতির পানি খাদ্যাভাবের অভাবে মারা গেছে। 
6.উদ্ভিজ্জ প্রমাণ:
ব্রাজিল ভারত আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া প্রাপ্ত গ্লসপটেরিস নামক এক প্রকার একপ্রকার ফান মহীসঞ্চরণ মতবাদের জোরালো সমর্থন করে উপরিউক্ত বিভিন্ন প্রমাণের ভিত্তিতে ওয়েগনার তার মহীসঞ্চরণ তত্ত্বের এবং পরবর্তী সময়ে সেটি ভেঙ্গে বিভিন্ন মহাদেশ এভাবে সঞ্চারিত হওয়ার যুক্তি দেখিয়েছেন। 

মহীসঞ্চরণ তত্ত্বের সমালোচনা:
আলফ্রেড ওয়েগনার 1912 সালে খ্রিস্টাব্দে প্রথম মহীসঞ্চরণ কথা বললেও 1924 খ্রিস্টাব্দে যখন তত্ত্বটি ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়, তখন বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ যেমন A. Washington, H. jafrey, এবং E.W.Berry প্রমূখরা সমালোচনা করেন যেসব কারণে মহীসঞ্চরণ তত্ত্বটি সমালোচিত হয়। সেগুলি হল-
1.প্রয়োজনীয় বল বা শক্তির অভাব:
বিভিন্ন ভূবিজ্ঞানী হিসাব করে দেখেছেন যে মহাদেশীয় সঞ্চারণ এর জন্য যে বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন তা জোয়ারি বল থেকে হাজার কোটি গুণ বেশি হওয়া দরকার। এছাড়া বৈষম্যমূলক অভিকর্ষক বলও মহীসঞ্চরণ এর জন্য  যথেষ্ট নয়। 
2.ত্রুটিপূর্ণ জিগ-স-ফিট:
ওয়েগনারের বিচ্ছিন্ন মহাদেশ গুলি উপকূলরেখার মধ্যে যে মিল দেখিয়েছেন  বিশেষত আটলান্টিক মহাসাগরের পূর্ব পশ্চিম উপকূলে জোড়া যতটা নিখুঁত দেখিয়েছেন, বাস্তবে তা কিন্তু ঠিক নয়। 
3.পর্বত সৃষ্টি সংক্রান্ত ব্যাখ্যা দুর্বলতা:
উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তে আন্দিজ, রকি প্রভৃতি পর্বতের উৎপত্তি সম্পর্কে ওয়েগনারের ব্যাখ্যা কেউ মেনে নেননি। 
4.আগ্নেয় শিলার সাদৃশ্যগত অস্পষ্টতা:
ওয়াশিংটনে মতে ওয়েগনার আটলান্টিকের দু'পাশের মহাদেশ গুলি শিলাস্তর বিশেষত্ব আগ্নেয় শিলার মধ্যে যে সাদৃশ্য দেখিয়েছেন বাস্তবের সঙ্গে তার মিল নেই। 
5.সূচনা সময়কাল সম্পর্কিত অস্পষ্টতা:
ওয়েগনার কার্বনিফেরাস যুগে প্যানজিয়ার ভাঙ্গন এবং মহাদেশগুলির সঞ্চারনের সময়কাল বলে চিহ্নিত করেন । কিন্তু তার আগে কোনো শক্তি প্যানজিয়াকে একত্রে রেখেছিল তার কোন উত্তর তিনি দেননি। 
6.জীবাশ্ম সংক্রান্ত চুক্তি দুর্বলতা:
অস্ট্রেলিয়া, ভারত, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ছাড়াও আফগানিস্তান, ইরান ও সাইবেরিয়াতে গ্লসপটেরিস উদ্ভিদের নিদর্শন  পাওয়া যায়। কিন্তু এই সব নতুন নতুন জায়গায় জীবাশ্ম প্রাপ্তির কারণ বর্ণনা করতে হলে মহীসঞ্চরণ মতবাদকে নতুন ভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। 

বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা এই মতবাদের সমালোচনা করলেও আরথার হোমস, এভারেস্ট স্মিথ প্রমূখ বিজ্ঞানীগণ আধুনিক তত্ত্বের মাধ্যমে মহীসঞ্চরণ মতবাদকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। কারণ তত্ত্বের মাধ্যমে ভূতাত্ত্বিক, জীবতাত্ত্বিক এবং প্লেট ভূ-গাঠনিক মতবাদের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।


 

Saturday, August 22, 2020

পাত সংস্থান তত্ত্ব - Plate tectonics theory

পাত সংস্থান বা প্লেট টেকটোনিক

1965 খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত "নেচার" পত্রিকা কানাডার ভূ- পদার্থবিদ জে.টি.উইলসন সর্বপ্রথম পাত বা প্লেট শব্দটি ব্যবহার করেন। 1912 খ্রিস্টাব্দে ওয়েগনারের মহাদেশীয় সঞ্চালন তত্ত্ব এবং 1960 খ্রিস্টাব্দে হ্যারিহেসের সমুদ্র তলদেশের সম্প্রসারণ তত্ত্ব উইলসনের পাত ভূ-গঠন তত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করে। এরপর 1967 খ্রিস্টাব্দে ম্যাকেঞ্জি ও পার্কার নামে দুই বিজ্ঞানী পাতের চলন আলোচনা করেন। 1968 খ্রিস্টাব্দে ডব্লু.জে.মর্গ্যান পাত তত্ত্বের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। 



ফরাসি বিজ্ঞানী লা ৺পিচো পাত তত্ত্বের সর্বাধুনিক ব্যাখ্যা দেন। তার ব্যাখ্যায় গতির ফলে পর্বত, খাত, সামুদ্রিক শৈলশিরা, ভূমিকম্প, অগ্ন্যুদগম, সুনামি, তপ্ত বিন্দু বা হটস্পট প্রভৃতি সৃষ্টি সম্বন্ধে সামগ্রিক ধারণা পাওয়া যায়। এই অবদানের জন্য লা ৺পিচোকে পাত তত্ত্বের প্রকৃত জনক বলা হয়। এই তথ্যই মহীসঞ্চরণ ও সমুদ্র তলদেশের সঞ্চরণকে দৃঢ় ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছে। 

পাত এর সংজ্ঞা:
পৃথিবীর মহাদেশ ও মহাসাগর গুলো কঠিন খন্ড হিসাবে অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের উপর ভাসমান। এই ভাসমান অংশগুলিকে পাত বা প্লেট বলে। 
অন্যভাবে বলা যায়, ভূত্বক বা শিলামন্ডল বিভিন্ন আয়তনে বিভক্ত এক একটি ভাগকে পাত বা প্লেট বলে। 
তত্ত্বের মূল বক্তব্য:
1.মহাদেশীয় এলাকায় পাতগুলি পুরু এবং মহাসাগরীয় এলাকায় পাতগুলি পাতলা। 
2. পাতগুলির গর গভীরতা 100 কিমি। 
3.পাতগুলি সান্দ্র অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের ওপর ভাসছে। 
4.ভূগর্ভের প্রচন্ড উষ্ণতার জন্য সৃষ্ট পরিচলন স্রোতের প্রভাবে পাতাগুলি গতিশীল অবস্থায় রয়েছে। 
5.পাতগুলির সীমানা বরাবর ভূত্বকের পরিবর্তন ঘটে চলেছে। 

পাতের শ্রেণীবিভাগ:
ইহাকে দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। যথা-
1.অবস্থান অনুসারে শ্রেণীবিভাগ 2.আয়তন অনুসারে শ্রেণীবিভাগ
অবস্থান অনুসারে শ্রেণীবিভাগ:
অবস্থান অনুসারে পাতকে দুটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। যথা-
1.মহাদেশীয় পাত
2.মহাসাগরীয় পাত
মহাদেশীয় পাত:
ভূত্বকের উপর মহাদেশ গুলি যে কঠিন শিলার চাদর দিয়ে তৈরি, তাকে মহাদেশীয় পাত বলে। এই পাতগুলি প্রধানত গ্রানাইট শিলা দ্বারা গঠিত। এই পাতগুলির ঘনত্ব 2.8 গ্রাম/ঘনসেমি। এই পাতগুলির গড়়বেধ 20 থেকে 70 কিমি। এই পাতগুলি সিলিকা ও অ্যালুমিনিয়াম দ্বারা গঠিত। উদাহরণ- ইউরেশীয় পাত। 
মহাসাগরীয় পাত:
ভূত্বকের ওপর মহাসাগরের তলদেশ যে কঠিন শিলার চাদর দিয়ে তৈরি, তাকে মহাসাগরীয় পাত বলে। এই পাতগুলি প্রধানত ব্যাসল্ট শিলা দিয়ে গঠিত। এই পাতগুলির গড় ঘনত্ব 2.9 গ্রাম/ঘনসেমি -3.3গ্রাম/ঘনসেমি। পাতগুলির গড়়বেধ 8 কিমি। এই পাতগুলি প্রধানত সিলিকা ও  ম্যাগনেসিয়াম দ্বারা গঠিত। উদাহরণ - প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত

আয়তন অনুসারে শ্রেণীবিভাগ:
আয়তন অনুসারে পাতকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। যথা- 1.বৃহদায়তন পাত
2.ক্ষুদ্রায়তন পাত
বৃহদায়তন পাত:
পৃথিবীতে মোট 7টি বড় পাত আছে। যথা- 
প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত 
উত্তর আমেরিকা পাত
দক্ষিণ আমেরিকা পাত
আন্টার্টিকা পাত
আফ্রিকা পাত
ইউরেশীয় পাত
ভারতীয় পাত
ক্ষুদ্রায়তন পাত
পৃথিবীতে মোট 8টি মাঝারি ও 20টি ছোট পাতা আছে। যথা-আরবীয় পাত, পানামা পাত , সোমালিপাত প্রভৃতি। 

বিভিন্ন প্রকার পাত সীমান্ত:
পাত সীমান্ত:
ক্ষুদ্রমন্ডল এর ওপর সঞ্চারণশীল ভাসমান মহাদেশীয় ও মহাসাগরীয় দুই বা তিনটি পাতের মিলনক্ষেত্রকে পাত সীমানা বা পাত সীমান্ত বলে। 
সাধারণভাবে বিজ্ঞানীরা চার প্রকার পাত সীমান্তের অস্তিত্ব লক্ষ্য করেছেন। যথা-
1.অভিসারী পাত সীমানা বা ধ্বংসাত্মক পাত সীমানা
2.প্রতিসারী পাত সীমানা বা গঠনকারী পাত সীমানা
3.নিরপেক্ষ পাত সীমানা বা ট্রান্সফর্ম চ্যুতি
4.ত্রিপাত সীমানা
অভিসারী পাত সীমানা বা ধ্বংসাত্মক পাত সীমানা:
দুটি সমধর্মী বা ভিন্নধর্মী পাত যখন পরস্পরের দিকে এগিয়ে এসে মিলিত হয় তখন তাকে অভিসারী পাত সীমানা বলে। এই পাত সীমানায় একটি পাত নিম্নগামী হয়়ে ভূঅভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং প্রচণ্ড উষ্ণতায় গলে যায়, তাই একে বিনাশকারী বা ধ্বংসাত্মক পাত সীমানা বলে। 
পাতের প্রকৃতি অনুসারে অভিসারী পাত সীমান্তকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
1.মহাদেশীয়-মহাদেশীয় পাত সীমানা 
2.মহাসাগরীয়-মহাসাগরীয় পাত সীমানা 
3.মহাদেশীয়-মহাসাগরীয় পাত সীমানা

মহাদেশীয়-মহাসাগরীয় মহাদেশীয় পাত সীমানা:
দুটি সমধর্মী মহাদেশীয় পাতের মিলনস্থলে সংঘর্ষ হলে, তাকে মহাদেশীয়-মহাদেশীয় পাত সীমানা বলে। 
সৃষ্ট ভূমিরূপ:
অভিসারী চলন এর ফলে দুটি পাতা পরস্পরের মুখোমুখি হয় এবং ভারীপাত অপেক্ষাকৃত হালকা পাতের নীচে ভূগর্ভে ঢুকে যায়। 
ভঙ্গিল পর্বত গঠন গঠিত হয় যেমন-হিমালয় পর্বত। 
উদাহরণ-ভারতীয় পাত ও ইউরেশীয় পাতের মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে হিমালয় পর্বতের সৃষ্টি হয়েছে। 

মহাসাগরীয় মহাসাগরীয় পাত সীমানা:
দুটি ভারী মহাসাগরীয় পাতের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে, তাকে মহাসাগরীয়-মহাসাগরীয় পাত সীমানা বলে। 
সৃষ্ট ভূমিরূপ: বৃত্তচাপীয় দ্বীপমালা সৃষ্টি। 
উদাহরণ- প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও ভারত মহাসাগরীয় পাতের সংঘর্ষের ফলে ইন্দোনেশিয়া দ্বীপসমূহের সৃষ্টি হয়েছে। 

মহাদেশীয় মহাসাগরীয় পাত সীমানা:
অপেক্ষাকৃত ভারী মহাসাগরীয় পাত ও হালকা মহাসাগরীয় পাতের সংঘর্ষে মহাসাগরীয় মহাদেশীয় পাতের তলায় প্রবেশ করে এই সীমান্তকে মহাদেশীয় মহাসাগরীয় পাত সীমান্ত বলে। 
সৃষ্ট ভূমিরূপ: আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি হয়। কাডিিলেরা জাতীয় পর্বত শ্রেণী সৃষ্টি হয়। 
উদাহরণ-উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা পাতের নিচে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাতের চলন এর ফলে দুই আমেরিকার পশ্চিম ভাগে রকি, আন্দিজ প্রভৃতি ভঙ্গিল পর্বতশ্রেণী গঠিত হয়েছে। 

প্রতিসারী পাত সীমানা বা গঠনকারী পাত সীমানা:
যে পাত সীমানা বরাবর দুটি পাত পরস্পর থেকে দূরে সরে যায় সেই  সীমানাকে প্রতিসারী পাত সীমানা বলে।দুটি পাত পরস্পর থেকে দূরে সরে গেলে যে শূন্যস্থান সৃষ্টি হয় সেই স্থান দিয়ে ভূ অভ্যন্তরস্থ উত্তপ্ত গলিত ম্যাগমা ও লাভার  রূপে বেরিয়ে আসে এবং নতুন ভূত্বকের সৃষ্টি করে, তাই এই সীমানাকে গঠনকারী পাত সীমানা বলে। 
সৃষ্ট ভূমিরূপ: এই সীমানা বরাবর সামুদ্রিক শৈলশিরা (মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা), মহাসাগর (আটলান্টিক মহাসাগর), গস্ত উপত্যকা (আফ্রিকার পূর্ব ভাব),সাগর (লোহিত সাগর) প্রভৃতি সৃষ্টি  হয়েছে। 

নিরপেক্ষ পাত সীমানা বা ট্রান্সফর্ম চ্যুতি:
ভূপৃষ্ঠে ফাটল বরাবর উলম্ব দিকে ভূত্বকের সরন না হয়ে যখন দুটি পাত পাশাপাশি অবস্থান করে এবং একটি পাত অন্য একটি পাতের বিপরীত দিকে অনুভূমিকভাবে সরণ ঘটলে যে চ্যুতির সৃষ্টি হয়, তাকে ট্রান্সফর্ম চ্যুতি বলে। এই সীমান্তকে নিরপেক্ষ সীমান্ত বলে। এই সীমান্ত বরাবর ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। 
উদাহরণ- ক্যালিফোর্নিয়া সানা আন্দ্রিজ চ্যুতিরেখা প্রায় হাজার কিমি দীর্ঘ এবং এই রেখা বরাবর প্রায় পাঁচশ ষাট কিমি ব্যাপী  চলন হয়েছে। 

ত্রিপাত সীমানা:
যে অঞ্চলে তিনটি পাত একে অপরের মুখোমুখি হয়, তাকে ত্রিপাত সীমানা বলে। 
উদাহরণ- আন্টার্টিকা পাত, প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত ও নাজকা পাতের মিলন স্থলে এইরূপ ত্রিপাত সীমানা দেখা যায়। 



Sunday, August 16, 2020

জলদূষণ (Water pollution)

জলদূষণ(Water pollution)

জলে বিভিন্ন অবাঞ্ছিত রাসায়নিক বা জৈব পদার্থ, জীবাণু মিশে গিয়ে জল মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেলে এবং জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে গেলে জল দূষিত হয়।
 
তোমরা বাড়ির অ্যাকোরিয়ামের জলে যদি কোনও ভাবে একটু ফিনাইল বা কেরোসিন তেল মিশে যায়, তবে কি মাছগুলো আর বেঁচে থাকবে? দেখবে কিছুদিনের মধ্যে মাছ গুলো সব মারা যাবে। 



জলদূষণের কারণ(Causes of water pollution):-

1.শিল্প কলকারখানা থেকে জল দূষণ:
পেট্রো-রাসায়নিক শিল্পে, পলিথিন-প্লাস্টিক শিল্পে, জ্বালানি শিল্পে খনিজ তেল পরিশোধন শিল্পে, বিভিন্ন রকম যানবাহন নির্মাণ, ছোট ও মাঝারি ইলেকট্রিক্যাল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পে প্রচুর পরিমাণে দূষিত রাসায়নিক পদার্থ, যেমন- অ্যামোনিয়া, ক্লোরিন, ফেনল, এবং বিভিন্ন ধাতু, জিংক, পারদ, সিসা, ক্রোমিয়াম ঘটিত দূষক নালা, নর্দমা দিয়ে নদী বা সমুদ্রের জলে মিশে জল দূষণ করছে। 
2.গৃহস্থালি থেকে জলদূষন:
গ্রাম এবং শহর এলাকার বিভিন্ন আবর্জনা ও বর্জ্য পদার্থ যেমন গৃহস্থালির দৈনন্দিন রান্না খাবারের টুকরো, দূষিত বস্তু, শৌচাগারের মলমূত্র, সাবান, ডিটারজেন্ট, ফিনাইল প্রভৃতি নিকাশি নালার মাধ্যমে ভূগর্ভের জলে, নদীতে, জলাশয়ে পড়ে জলকে দূষিত করে তোলে । এছাড়াও বিভিন্ন পশুশালা, বড়বাজার, হাসপাতাল, চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে উৎপন্ন জলকে দূষিত করে। 
3.কৃষি ক্ষেত্র থেকে জলদূষন:
চাষের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক সার, কীটনাশক , আগাছানাশক ব্যবহার করা হয়। বৃষ্টির জলে ধুয়ে এই সমস্ত বিষাক্ত রাসায়নিক ভূগর্ভের জলে, জলাশয়ে, নদীতে মিশে জল দূষিত করে। এই সারে থাকা নাইট্রেট এর কারণে ক্যান্সার হতে পারে । শিশুদের মাথায় রক্ত চলাচলে অসুবিধা ঘটায়। 
4.তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে দূষণ:
পারমাণবিক চুল্লি, চিকিৎসাকেন্দ্র বা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা গারে ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় পদার্থ গুলো ব্যবহারের পর সমুদ্র বা নদীতে ফেলা হয়। পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর তেজস্ক্রিয় পদার্থ জলে মিশে জল দূষণ ঘটায়। 
5.খনিজ তেল থেকে দূষণ:
দুর্ঘটনাগ্রস্ত তেলবাহী জাহাজ থেকে অথবা সমুদ্র অবস্থিত তেলের খনির তেল সমুদ্রে মিশে জল দূষণ ঘটায়। 
6.তাপীয় দূষণ:
তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, পারমাণবিকবিদ্যুৎ কেন্দ্র , কলকারখানায় ব্যবহৃত উষ্ণ দূষিত বজ্য জল সরাসরি জলাশয়ে, নদীতে নিচে জলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে দেয় ও জল দূষণ ঘটায়। 
7.বায়ু দূষণের কারণে জল দূষণ:
কলকারখানা এবং যানবাহনের ধোঁয়া মাধ্যমে বাতাসে সালফার ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, কার্বন মনো অক্সাইড ইত্যাদি জমা হয়। বৃষ্টির জলের সঙ্গে সালফার-ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রজেন-ডাই-অক্সাইড বিক্রিয়া করে। বিভিন্ন জলাশয়ে জলকে আম্লিক করে দেয়। 
8.আর্সেনিক দূষণ:
মাটির নিচের স্তর থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে অতিরিক্ত জল তুলে নেওয়ার যোগ হলে ফলে মাটির নিচে ফাঁকা জায়গায় আর্সেনিকের যৌগ বাতাসের সঙ্গে বিক্রিয়া করে বিষাক্ত যৌগ তৈরি করে। এই যৌগ জলে মিশে নলকূপের জলের মাধ্যমে পানীয় জলে মিশে যায়, জলে ফ্লুওরিনের যৌগ, ক্লোরিন অতিরিক্ত পরিমাণে থাকলেও জল দূষিত হয়। 

জলদূষণের প্রভাব(Impact of water pollution) :-

1.1932 জাপানে মিনামাটা উপসাগরের উপকূলে একটা রাসায়নিকের কলকারখানা থেকে পারদযুক্ত তরল বজ্র সমুদ্রে ফেলা হয়। এই মারাত্মক পারদ দূষণে প্রায় 30 বছর ধরে অসংখ্য মানুষ এবং জীব জন্তু মারা যায়। 
2.উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় কুয়েতে প্রচুর তেলের কূপ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। প্রচুর পরিমাণে খনিজ তেল পারস্য উপসাগরের জলে মিশে অসংখ্য সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যু হয়। 
3.হলদিয়া পেট্রোরসায়ন শিল্প গড়ে ওঠার পর থেকে হলদি নদীর মোহনায় ইলিশ মাছের আনাগোনা কমে গেছে। 
4.সাবান, ডিটারজেন্ট ফসফেট বদ্ধ পুকুর, জলাশয়ের জলে মিশলে প্রচুর পরিমাণে শৈবাল, আগাছা, কচুরিপানা বেড়ে যায়। এর ফলে জলে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গিয়ে মাছ ও জলজ প্রাণীরা মারা যায়। একে ইউট্রোফিকেশন বলে। 
5.পশ্চিমবঙ্গের মালদা, নদিয়া, হুগলি, হাওড়া, বর্ধমান ও দক্ষিণ 24 পরগনা জেলার মাটির নিচের জলে অনেক বেশি মাত্রায় আর্সেনিক রয়েছে। এরফলে হাতের চেটো পায়ের তলায় যে কালো কালো ক্ষত হয়, তাকে ব্ল্যাকফুট ব্যাধি বলে। এছাড়াও চর্মরোগ, রক্তাল্পতা, যকৃত, ফুসফুস, ত্বকের ক্যান্সার হতে পারে। ফ্লুরাইড দূষণ থেকে ফ্লুরোসিস, দাঁত , হাড়ের সমস্যা, পারদ দূষণে মিনামাটা, ক্যাডমিয়াম দূষণের ইতাই-ইতাই অসুখ হয়। 

জলদূষণ প্রতিরোধ(Water pollution prevention):-

জলদূষণ আটকানোর সঙ্গে সঙ্গে জলের অতিরিক্ত ব্যবহার কমানো এবং বেশি পরিমাণে পুনর্ব্যবহার করলে তবেই সারা পৃথিবীব্যাপী তীব্র জল সংকট মেটানো যেতে পারে। 
1.জলাশয়, নদী বা সমুদ্রের জলে নোংরা আবর্জনা সরাসরি  ফেলা যাবে না, গরু-মোষ স্নান করানো, কাপড় কাচা বন্ধ করতে হবে। 
2.চাষের ক্ষেতে অতিরিক্ত সার, কীটনাশক দেওয়া বন্ধ করতে হবে। 
3.শহর এবং কলকারখানার দূষিত বর্জ্য জল শোধন করে তবেই নদী বা সমুদ্রের ফেলা উচিত। ব্যবহার করা জল পরিশোধন করে পুনর্ব্যবহার করতে হবে। 
4.তাপবিদ্যুৎ, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য গরম জল ঠান্ডা করে তবেই নদী বা সমুদ্রে ফেলা উচিত। 
5.বিভিন্ন রকম ব্যাকটেরিয়া, শৈবাল এবং রাসায়নিকের মাধ্যমে সমুদ্রে ভাসমান তেলর দূষণ দূর করা যায়। 
6.নিরাপদ পানীয় জলের জন্য নলকূপের জলদূষণের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করে, বিশুদ্ধ জল সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। 
7.দরকার না থাকলে জলের কল বন্ধ করে রাখতে হবে। এতে একদিকে যেমন বিশুদ্ধ জল নষ্ট হবেনা। অন্যদিকে দূষিত জলের পরিমাণও কমবে। 
8.পরিবেশের ক্ষতি করবে না এরকম জিনিস (যেমন কম ক্ষার বা ক্ষারহীন সাবান, শ্যাম্পু, ডিটারজেন্ট) ব্যবহার করতে হবে। 
9.বাড়ির নোংরা আবর্জনা, তরল বজ্র এমন জায়গায় ফেলা উচিত যাতে কোনোভাবে তা বিশুদ্ধ জলের সঙ্গে  না মিশে। 


Saturday, August 8, 2020

শিলা (আগ্নেয় শিলা ,পাললিক শিলা, রূপান্তরিত শিলা)

শিলা(Rock):

পৃথিবী যে শক্ত আবরণে ঢাকা তা হলো শিলা। শিলা আসলে প্রকৃতিতে প্রাপ্ত এক বা একাধিক খনিজের সমসত্ত্ব বা অসমসত্ত্ব মিশ্রণ। আর যে খনিজ দিয়ে শিলা গঠিত হয় তা হল এক বা একাধিক অজৈব মৌলিক পদার্থের যৌগ। যেমন- গ্রানাইট শিলা কোয়াটজ ,ফেল্ডসপার, মাইকা ও হনর্ব্লেন্ড খনিজে দ্বারা গঠিত। আবার চুনাপাথর শুধুমাত্র ক্যালসাইট অথবা আ্যরাগোনাইট খনিজ দিয়ে গঠিত। 

প্রকৃতিতে বিভিন্ন রকমের শিলা দেখতে পাওয়া যায় । এদের সৃষ্টি আর বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে শিলাকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
1.আগ্নেয় শিলা 
2.পাললিক শিলা
3.রূপান্তরিত শিলা



আগ্নেয় শিলা(Igneous Rock):

পৃথিবী সৃষ্টির সময় উত্তপ্ত ও তরল অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে তাপ বিকিরণ করে ভূত্বকের মধ্যে ও ওপরে প্রথমে যে কঠিন শিলার সৃষ্টি হয়, সেটি হলো আগ্নেয় শিলা।পৃথিবীতে প্রথম সৃষ্টি হওয়ায় এই শিলার আরেক নাম প্রাথমিক শিলা। ভূ-অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধাতব পদার্থ যেমন- সিলিকন, লোহা, নিকেল, ম্যাগনেসিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম প্রভৃতি উত্তপ্ত ও গলিত অবস্থায় ম্যাগমা রূপে থাকে। এই ম্যাগমা অভ্যন্তরের প্রবল চাপে লাভা রূপে ভূপৃষ্ঠে উঠে এসে বা ভূ-অভ্যন্তরেই ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে জমাট বেঁধে আগ্নেয় শিলার সৃষ্টি করে ।
উৎপত্তি  অনুসারে আগ্নেয় শিলাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয় । যথা-
1. নিঃসারী আগ্নেয় শিলা 
2. উদবেধী আগ্নেয় শিলা

নিঃসারী আগ্নেয় শিলা:
ভূ-অভ্যন্তরের অত্যধিক চাপে উত্তপ্ত গলিত ম্যাগমা ভূত্বকের কোন দুর্বল এর মধ্য দিয়ে ভূপৃষ্ঠে লাভা রূপে এসে শীতল ও কঠিন হয়ে যে আগ্নেয় শিলা সৃষ্টি করে তার নাম নিঃসারী আগ্নেয় শিলা। খুব দ্রুত জমাট বেঁধে গঠিত হয় বলে এর দানাগুলো বেশ সূক্ষ্ম হয়। যেমন- ব্যাসল্ট শিলা, অবসিডিয়ান
উদবেধী আগ্নেয় শিলা:
ভূ-অভ্যন্তরের গলিত ম্যাগমা ভূত্বকের দুর্বল ফাটল বা  ছিদ্রের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছাতে না পেরে অভ্যন্তরেই ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে উদবেধী আগ্নেয়শিলার সৃষ্টি করে। যেমন- গ্রানাইট,ডোলেরাইট। উদবেধী আগ্নেয় শিলা আবার দুরকমের হয়। যথা-1.উপপাতালিক 2.পাতালিক
  • উপপাতালিক শিলা: ম্যাগমা ভূ-অভ্যন্তরের কোন ফাটল বা ছিদ্রপথে ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে জমাট বেঁধে সৃষ্টি করে, উপপাতালিক শিলা। যেমন-ডোলেরাইট। 
  • পাতালিক শিলা: ম্যাগমা ভূ-অভ্যন্তরের একবারে তলদেশে অতি ধীরে ধীরে শীতল ও কঠিন হয়ে সৃষ্টি করে পাতালিক শিলা ।ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে জমাট বেঁধে বলে এই শিলার দানাগুলো কিছুটাাা স্থূল হয়। যেমন- গ্রানাইট। 


আগ্নেয় শিলার বৈশিষ্ট্য:
1.আগ্নেয় শিলা উত্তপ্ত পদার্থ জমাট বেঁধে সৃষ্টি হয় বলে এই শিলা কাঁচের মতো স্ফটিকাকার হয় । 
2.আগ্নেয় শিলায় কোন স্তর থাকে না, তাই একে অস্তর ভুত শিলাও বলে। 
3.আগ্নেয় শিলা কঠিন বলে সহজে ক্ষয় হয় না ও অপ্রবেশ্য। 
4.আগ্নেয় শিলায় জীবাশ্ম দেখা যায় না। 
5.আগ্নেয় শিলার উপাদানগুলি দৃঢ় ও সঙ্ঘবদ্ধ ।  সহজে রাসায়নিক আবহবিকার এর দ্বারা আক্রান্ত হয় না। 
6.আগ্নেয় শিলায় উলম্ব দারণ ও ফাটল দেখা যায়, তাই প্রবেশ্যতা বেশি। 

পাললিক শিলা(Sedimentary Rock):

আগ্নেয় শিলা বহুদিন ধরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ক্ষয়কারী শক্তি যেমন- নদী, হিমবাহ, বায়ু, সমুদ্রতরঙ্গ প্রভৃতির প্রভাবে উৎস স্থান থেকে ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত ও পরিবাহিত হয়ে কোন সমুদ্র, হদ বা নদীর তলদেশে জমা হতে থাকে। এইভাবে বছরের-পর-বছর ক্ষয়প্রাপ্ত পদার্থগুলো স্তরে স্তরে সঞ্চিত হয় এবং চাপের ফলে জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে পাললিক শিলার সৃষ্টি করে। এই শিলার মধ্যে বালি, পলি ও কাদার ভাগ বেশি থাকে। পলি জমাট বেঁধে সৃষ্টি হওয়ায় এর নাম পাললিক শিলা। যেমন-চুনাপাথর, বেলেপাথর, কাদাপাথর। 

পলির উৎপত্তি অনুসারে পাললিক শিলা কে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যথা-
 1.সংঘাত ও 2.অসংঘাত
সংঘাত শিলা:
প্রাচীন শিলা চূর্ণ-বিচূর্ণ ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বহুদিন ধরে জমাট বেঁধে যে শিলার সৃষ্টি করে তা হল সংঘাত শিলা। 
অসংঘাত শিলা:
রাসায়নিক উপায় বা জৈবিক উপায়ে সৃষ্ট শিলা হল অসংঘাত শিলা। যেমন-চুনাপাথর, লবণ শিলা। 

এছাড়াও যান্ত্রিক উপায়ে গঠিত পাললিক শিলা তিন প্রকারের।যথা- 
1.চুনাপাথর 
2.বেলেপাথর 
3.কাদাপাথর


পাললিক শিলার বৈশিষ্ট্য:
1.স্তরায়ন পাললিক শিলার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এই  শিলা তে তীর্যক, সমান্তরাল ও মিশ্র স্তরায়ন দেখা যায়। 
2.জীবাশ্ম পাললিক শিলা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। একমাত্র এই শিলাতেই  র্জীবাশ্ম দেখা যায়। 
3.পাললিক শিলাতে সমুদ্রতরঙ্গের চিহ্ন, বৃষ্টির চিহ্ন প্রভৃতি দেখা যায় । 
4.কয়লা , খনিজ তেল, প্রাকৃতিক গ্যাসের ভান্ডার এই পাললিক শিলা। 
5.এই শিলায় সচ্ছিদ্রতা ও ভঙ্গুরতা দেখা যায়। 
6.এই শিলার প্রবেশ্যতা খুব বেশি। 
জীবাশ্ম(Fossil):
স্তরে স্তরে জমাট বেঁধে পাললিক শিলা সৃষ্টির সময় কখনও কখনও সামুদ্রিক উদ্ভিদ বা প্রাণী তার মধ্যে চাপা পড়ে যায়। পরে পাললিক শিলার মধ্যে ওই উদ্ভিদ বা প্রাণীর দেহে প্রস্তরীভূত হলে তাদের দেহাবশেষের ছাপ থেকে যায়। একে বলে জীবাশ্ম । 

রূপান্তরিত শিলা(Metamorphic Rock):

আগ্নেয় ও পাললিক শিলা ভূঅভ্যন্তরের প্রচন্ড চাপ, তাপ, নানা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে তার পুরনো ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম হারিয়ে সম্পূর্ণ নতুন ধর্ম বিশিষ্ট শিলায় পরিণত হয়। একেই বলে রূপান্তরিত শিলা। অনেকভাবেই শিলার রূপান্তর হতে পারে। যেমন- 1.অধিক তাপে (কয়লা থেকে গ্রাফাইট) 2.প্রচন্ড চাপে (শেল থেকে সিলেট) 3.রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ( অ্যন্্ডালুসাইট থেকে  সিলিমেনানাইট ) । 
প্রধানত চাপের ফলে বিশাল অঞ্চল জুড়ে শিলার আঞ্চলিক বা ব্যাপক রূপান্তর ঘটে। যেমন- সেলেট।  স্পর্শ বা তাপের ফলে শিলার  স্পর্শ বা স্থানীয় রূপান্তর হয়ে থাকে । যেমন- মার্বেল


রূপান্তরিত  শিলার বৈশিষ্ট্য:
1.রূপান্তরের ফলে আগ্নেয় বা পাললিক শিলা অনেক বেশি কঠিন হয়ে যায়। 
2.আগ্নেয় শিলার রূপান্তরিত হলে তা আগের তুলনায় আরো মসৃণ, চকচকে ও কেলাসিত হয়ে যায়। 
3.পাললিক শিলার রূপান্তরিত হলে তার ভঙ্গুরতা কমে যায়। 
4. আগ্নেয় শিলা রূপান্তরিত হয়ে ভেতরকার খনিজ পৃথক হয়ে পড়ে, তাই এখানে খনিজ সংগ্রহে সুবিধা হয়।
5.প্রচন্ড তাপে ও চাপে পাললিক শিলার জীবাশ্ম গুলি নষ্ট হয়ে যাই বলে রূপান্তর শিলা জীবাশ্মহীন। 

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়

মরু অঞ্চলের প্রতিরোধের উপায়: ১.ভূমিক্ষয় রোধ করা: মরু প্রান্তীয় এলাকায় মাটি ক্ষয় রোধ করতে ঢালু এলাকায় সমোন্নতিরেখা চাষ, বায়ুরোধক দেয়া...